প্রকৃতির মাঝে খাবার সংকটের কারণে কিশোরগঞ্জ জেলা শহরে বেড়েছে বানরের উৎপাত। সুযোগ পেলেই এই বানরগুলো ঢুকে পড়ছে এলাকার বিভিন্ন বাসাবাড়িতে। সেখান থেকে রান্না করা খাবার, এমনকি কাঁচা সবজি নিয়েও দৌঁড়ে পালাচ্ছে তারা। এমনকি হাতে কোনও ব্যাগ থাকলে তাতেও থাবা দিয়ে ছিনিয়ে যাচ্ছে। খাবারের সন্ধানে বনের থেকে আসা এই বন্য প্রাণীগুলো বিভিন্ন পরিস্থিতিতে হুমকির সম্মুখীন হচ্ছে। তাই ভারসাম্য রক্ষায় বানরগুলোকে নিরাপদ রাখতে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে আহ্বান জানিয়েছে স্থানীয়রা।একসময় বনজঙ্গলের ফলফলাদি খেয়েই বেঁচে থাকত বানরগুলো। বর্তমানে প্রতিনিয়ত ঝোপঝাড় ধ্বংস করায় বানরের আবাসস্থলেরও সংকট দেখা দিয়েছে। খাবারের সন্ধানে এদিক-ওদিক ছুটাছুটি করছে বানর। তারা এখন আবাসিক এলাকা ঘিরে আশ্রয় নেওয়ায় এই অত্যাচারের মাত্রা দিন দিন বাড়ছে।বুধবার (১০ সেপ্টেম্বর) বিকেলে জেলা শহরের বত্রিশ এলাকায় সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, খাবারের সন্ধানে এদিক-ওদিক ছোটাছুটি করছে বানর। কখনও ফল গাছে, কখনও বা ঘরের চালে। সকাল থেকে বিকেল, এভাবেই ঘুরে বেড়াচ্ছে বানর। প্রয়োজনীয় খাবার না পেয়ে বাসাবাড়িতেও হানা দিচ্ছে তারা। এতে অতিষ্ঠ হয়ে পড়েছেন স্থানীয় বাসিন্দারা। অনেকেই বানরকে তাড়িয়ে দিলেও আবার চলে আসে। আবার কেউ কেউ ডেকে খাবারও দেন। অনেকের রান্নাঘরের সামনে, ছাদে, কার্নিশে খাদ্যের জন্য চেয়ে থাকতে দেখা যায় বানরকে।এরই মধ্যে জেলা শহরের বত্রিশ জেলা স্মরণী নূরানী মসজিদ এলাকায় বাড়ির পাশের একটি ছাদে বেশ কয়েকজন বন্ধু নিয়ে খেলা করছিল মো. নূর মিয়া (৮) নামের এক স্কুল পড়ুয়া শিক্ষার্থী। এমন সময় একটি বানরের অতর্কিত হামলার শিকার হয় মো. নূর মিয়া। কামড়িয়ে তার পায়ের মাংস ছিঁড়ে নিয়ে যায় বানর। মো. নূর মিয়া বত্রিশ নূরানী সড়কের মো. ওবায়দুর রহমান রনির ছেলে।এ ব্যাপারে শিশু মো. নূর মিয়ার মা বলেন, ‘আমার ছেলে এখন একা ঘর থেকে বের হতে ভয় পায়। খেলতে ও স্কুলে যেতে চায় না। এরা খাবার না পেলেই বাড়ির ভিতরে ঢুকে মানুষের হাত থেকে খাবার কেড়ে নেওয়ার চেষ্টা করে। দ্রুত এদের খাবারের ব্যবস্থা করা উচিত।’মাসুমা আক্তার নামে এক গৃহিণী বলেন, ‘খাবার না পেয়ে বানর এখন বাসাবাড়িতে হামলা শুরু করেছে। তাদের জন্য ঘরের দরজা, জানালা সব সময় বন্ধ করে রাখতে বাধ্য হয়। মাঝেমধ্যে কোনওভাবে জানালা বা দরজা খোলা থাকলে ঘরে প্রবেশ করে সবকিছু তছনছ করে। বিশেষ করে রান্নাঘরে খাবারের সন্ধানে হাঁড়িপাতিল লণ্ডভণ্ড করে ফেলে। এ সময় বাধা দিলে আক্রমণ করে। এ কারণে লোকজন লাঠি দিয়ে ভয় দেখিয়ে সরিয়ে দেয়। এতে ক্ষিপ্ত হয়ে হামলা চালায় ক্ষুব্ধ বানরের দল।’ব্যবসায়ী রতন মিয়া বলেন, ‘কয়েকটি বানর সারাক্ষণ উৎপাত করে। প্রতিনিয়তই খাবারের জন্য বিভিন্ন দোকানে হানা দিয়ে কলাসহ নানা ফল নিয়ে যায়। বানরের অত্যাচারে আমরা অতিষ্ঠ। ওদের কারণে আমরা ঠিকমতো ব্যবসা করতে পারি না। এক পলকের মধ্যে ছো মেরে খাবার নিয়ে পালিয়ে যায়। অনেক সময় বাধ্য হয়ে লাঠি দিয়ে তাড়াতে হয়। এদের সঠিকভাবে খাদ্যের ব্যবস্থা করা জরুরি হয়ে পড়েছে।’স্থানীয় বাসিন্দা সালেক হোসেন রনি বলেন, ‘সরকার থেকে খাবারের যে বরাদ্দ দেয়া হয়েছে, তা কখনই চোখে পড়ে না। এজন্য প্রতিনিয়তই বাসা-বাড়ি ও দোকানে খাবারের জন্য বানর হানা দেয়। এছাড়া গাছের ফল সবজি খেয়ে ফেলে ও নষ্ট করে।’মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক গবেষক ও লেখক জাহাঙ্গীর আলম জাহান বলেন, ‘বনে বড় বড় গাছ নেই। বানর বড় গাছ খুঁজে সেখানে আনন্দে ঘুরে লাফালাফি করে থাকে। বর্তমানে সেটা নেই বললেই চলে। প্রাকৃতিক পরিবেশে জন্ম নেওয়া বানরগুলো আজ খাদ্যের অভাবে বিলুপ্তির পথে। এই ঐতিহ্যকে ধরে রাখার জন্য সরকারসহ স্থানীয় স্বেচ্ছাসেবী সংগঠনগুলোকে এগিয়ে আসতে হবে। পাশাপাশি বর্তমানে বানরে খাবারের জন্য যে বরাদ্দ এসেছে, তা যেন সঠিকভাবে পায় সেদিকে সংশ্লিষ্টদের নজর রাখতে হবে। দ্রুত ইকোপার্কটি চালু করে বানরদের জন্য অভয়ারণ্য গড়ে তোলারও আহ্বান জানান তিনি।’এসআর
Source: সময়ের কন্ঠস্বর
