পায়ে আলতা, খোপায় বাহারি ফুল, হাতে করতাল, আর মুখরিত পরিবেশে ঢোল ও মাদলের তালে রিমঝিম নাচ—এভাবেই রাজশাহীর নওগাঁয় উদযাপিত হলো সমতলের ক্ষুদ্র জাতিসত্তার অন্যতম বড় উৎসব কারাম।সোমবার (৮ সেপ্টেম্বর) বিকেলে জাতীয় আদিবাসী পরিষদ নওগাঁ জেলা কমিটির আয়োজনে এবং বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা ইনিশিয়েটিভ সোসাল চেঞ্জ (ISC)-এর আর্থিক সহযোগিতায় মহাদেবপুর উপজেলার নাটশাল সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় মাঠে আয়োজিত হয় উৎসবের মূল আনুষ্ঠানিকতা।এর আগে রোববার দিনব্যাপী উপজেলার নাটশাল, বকাপুর, জৈন্তাপুর, ঋষিপাড়াসহ আশপাশের গ্রামগুলোতে কারাম উৎসব উপলক্ষে ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠান পালন করেন আদিবাসী নারী-পুরুষ। তারা উপোস থেকে সন্ধ্যার আগে কারাম (খিল কদম) গাছের ডাল এনে পূজার বেদিতে স্থাপন করেন। সন্ধ্যায় পূজা শুরু হলে নারীরা দিয়াবাতি, শস্যবীজের ডালি, লাল মোরগ ও ফলমূল উৎসর্গ করেন সৃষ্টিকর্তার উদ্দেশে।পরে পুরোহিত কার্মা ও ধার্মা—দুই ভাইয়ের কিচ্ছা (ধার্মিক কাহিনি) বর্ণনা করেন নতুন প্রজন্মের উদ্দেশে। উপোস থাকা নারীরা একে অন্যকে খাবারের আমন্ত্রণ জানিয়ে উপোস ভাঙেন এবং রাতভর চলে ঢাক-ঢোল, মাদলের তালে গীত ও নৃত্য। সোমবার সকালে কারাম ডাল বিসর্জনের মধ্য দিয়ে পূজার আনুষ্ঠানিকতা শেষ হয়।সোমবার বিকেলে নাটশাল সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় মাঠে অনুষ্ঠিত হয় সাংস্কৃতিক মিলনমেলা ও ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী সমাবেশ। এতে মহাদেবপুর, পত্নীতলা, নিয়ামতপুরসহ জেলার বিভিন্ন উপজেলা এবং বাইরের জেলাগুলো থেকে ৫০টির বেশি আদিবাসী সাংস্কৃতিক দল অংশ নেয়।প্রতিটি দল নিজ নিজ জাতিসত্তার ঐতিহ্যবাহী গান, নাচ ও বাদ্যযন্ত্র পরিবেশন করে। ঢোল, মাদল, করতাল (ঝুমকি) ইত্যাদি লোকবাদ্যের তালে তালে প্রাণবন্ত পরিবেশনা দর্শকদের মুগ্ধ করে।কারাম মূলত বৃক্ষ পূজার উৎসব। ভাদ্র মাসের শুক্লা একাদশী তিথিতে এই উৎসব উদযাপিত হয়। ক্ষুদ্র জাতিসত্তার মানুষের বিশ্বাস—কারাম ডালের পূজায় সৌভাগ্য ও অভাবমুক্তি আসে। এটি শুধু ধর্মীয় উৎসব নয়, বরং ভাষা ও সংস্কৃতির আন্দোলনের একটি অংশ হিসেবেও পালন হয়ে আসছে।১৯৯৬ সাল থেকে জাতীয় আদিবাসী পরিষদ এই উৎসবকে কেন্দ্র করে বিভিন্ন এলাকায় আদিবাসী সম্মেলন ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান আয়োজন করে আসছে।বিকেল ৩টায় আনুষ্ঠানিকভাবে উৎসবের উদ্বোধন করেন জাতীয় আদিবাসী পরিষদ কেন্দ্রীয় কমিটির সভাপতি গণেশ মার্ডি। আলোচনা সভায় প্রধান অতিথি হিসেবে বক্তব্য রাখেন মহাদেবপুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা আরিফুজ্জামান।বিশেষ অতিথি ছিলেন,জাতীয় আদিবাসী পরিষদ কেন্দ্রীয় সাধারণ সম্পাদক বিমল চন্দ্র রাজোয়ার, আইএসসি সভাপতি ডি এম আব্দুল বারী, নির্বাহী পরিচালক আবুল হাসনাত, জাতীয় আদিবাসী পরিষদ নওগাঁ জেলা কমিটির উপদেষ্টা আজাদুল ইসলাম, পত্নীতলা ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী সাংস্কৃতিক একাডেমির পরিচালক যোগেন্দ্রনাথ সরকার প্রমুখ।এনআই
Source: সময়ের কন্ঠস্বর
