বরিশাল বিভাগে সাম্প্রতিক সময়ে একের পর এক হত্যাকাণ্ডে সৃষ্টি হয়েছে বিভীষিকাময় পরিস্থিতি। পারিবারিক দ্বন্দ্ব, আর্থিক লেনদেন ও মাদক-রাজনীতির প্রভাবে রক্তের বাঁধন ছিন্ন হচ্ছে অবলীলায়। স্বামী-স্ত্রী, ভাই-বোন, এমনকি বাবা-মায়ের হাতেও প্রাণ হারাচ্ছেন স্বজনেরা। শুধু আগস্ট মাসেই পাঁচটি হত্যার ঘটনা গোটা দক্ষিণাঞ্চলে চাঞ্চল্য তৈরি করেছে।গত ৩১ জুলাই সন্ধ্যায় বরিশালের একটি ঘটনা বেশিমাত্রিক আলোচনায় আসে। নগরীর পশ্চিম জনপদ কাউনিয়ার ত্রাস বাগান বাড়ির ছোট মিল্টন দল-বল নিয়ে নিজ বন্ধু লিটুকে প্রকাশ্যে কুপিয়ে হত্যা করে। উভয়ই জাতীয়তাবাদী স্বেচ্ছাসেবক দলের স্থানীয় পর্যায়ের নেতা। লিটনের বাড়ি অর্ধ কিলোমিটার দূরত্ব বিল্ববাড়ি গ্রামে হলেও সন্ধ্যার পূর্বে সেখানে মিল্টন উপস্থিত হয়ে এমন নির্মমতা চালায় যে, পরিকল্পিত হামলায় নিজ বন্ধু ঘটনাস্থলেই প্রাণ হারায়।এ ঘটনার পিছনে রয়েছে নিহত লিটুর আপন বোন জামাতার ইন্ধন। জামাতা জাকির গাজী দ্বিতীয় বিয়ে করায় প্রথমা স্ত্রী মুন্নি আক্তার ও ভাই লিটু মিলে প্রতিবাদ করায় প্রতিশোধপরায়ণ হয়ে সেই আপন দুলাভাই শ্যালককে হত্যার পরিকল্পনা করে এবং এতে ব্যবহার করে মিল্টন বাহিনীকে। এরপরই ৩১ জুলাই সন্ধ্যায় কুপিয়ে হত্যা করা হয় লিটন সিকদার লিটুকে। এ ঘটনা রাজনৈতিকভাবে দেখা হলেও এর পেছনে পারিবারিক দ্বন্দ্ব-সংঘাত রয়েছে, তা ঢাকা পড়ে যায় আলোচনার টেবিলে।ঘটনার পেক্ষাপটে রিয়াজ মাহমুদ খান ওরফে মিল্টনকে দল থেকে বহিষ্কার করা হয়। তিনি মহানগর স্বেচ্ছাসেবক দলের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক হিসেবে সাংগঠনিক দায়িত্বে ছিলেন। পক্ষান্তরে নিহত লিটন সিকদার লিটুও স্বেচ্ছাসেবক দল নেতা ছিলেন, কিন্তু তিনিও সাম্প্রতিক সংগঠন থেকে বহিষ্কার হয়েছিলেন। এলাকায় চাউর রয়েছে মিল্টন ও লিটু উভয়ই মাদক সিডিকেট নিয়ন্ত্রণ করতো।এই ঘটনার রেশ কাটতে না কাটতেই সবার চোখ ফিরে যায় পটুয়াখালী জেলার ঘটনা প্রবাহের দিকে। জেলার বাউফল উপজেলার একটি ঘটনা দিয়ে শুরু করলেই বোঝা যায় রক্তের বাঁধন ছিন্নে কতটা সহজ হয়ে উঠেছে বা নির্মমতা ঠেকেছে কোন কিনারে।গত ২৭ আগস্ট প্রকাশিত তথ্যের মধ্যে বাউফল উপজেলায় আপন বাবা-মা ও ভগ্নিপতি একত্রিত হয়ে নিজ মেয়েকে হত্যা করে পাশ্ববর্তী খালে ফেলে দেয়। ১৪ বছর বয়সি উর্মির অপরাধ এক যুবকের সাথে প্রেমের সম্পর্ক গড়ে তোলা। তাকে শাসনের পরও স্থানীয় ওই যুবকের ভালোবাসার টানে নিজের অবস্থান অনঢ় থাকায় গত ২০ আগস্ট গভীর রাতে শ্বাসরোধে হত্যা করে কিশোরী উর্মিকে। পুলিশ তার লাশ উদ্ধারের ছয় দিন পর নেপথ্যের কাহিনী উন্মোচিত হয়। গ্রেফতারকৃত বাবা-মা ও ভগ্নিপতি হত্যার দায় স্বীকার করে আদালতে বিবৃতিও দেয়।এরপরের আরেকটি ঘটনা আরও মর্মান্তিক নয় কি? একই উপজেলায় গত ৩১ জুলাই পরন্ত বিকেলে স্ত্রী সালমা আক্তার, মাদ্রাসাশিক্ষিকাকে নিজ গৃহে কুপিয়ে হত্যা করে পালিয়ে যায় স্বামী। অবশ্য পরে ঘাতক স্বামী সরোয়ার তাদের চার বছর বয়সি শিশুসন্তানকে নিয়ে গভীর রাতে থানায় উপস্থিত হয়ে নিজের অপরাধ স্বীকার করে স্ত্রী পরকীয়া প্রেমে জড়িয়ে পড়ার সন্দেহ থেকে এই হত্যাকাণ্ড করে বলে জানান দিয়ে অনুতপ্ত হন। স্বল্প দিনের ব্যবধানে এই দুটি ঘটনা বাউফলবাসী হতবুদ্ধি হয়ে পড়ে। সেই সাথে ছড়িয়ে পড়ে আতঙ্ক।গত ২০ আগস্ট আরও একটি ঘটনা এই অঞ্চলের মানুষের মাঝে দাগ কাটে। বরিশালের আগৈলঝাড়া উপজেলায় মেয়ে জামাই নিজ শ্বশুরকে শ্বাসরোধ করে হত্যা করে সামান্য কিছু টাকার জন্য। দুগ্ধ ব্যবসায়ী অখিল হালদার মন্টু নিজ জামাতা কৃষ্ণ বাড়ৈকে ৩০ হাজার টাকা লোন দিয়ে সময়সাপেক্ষে ফেরৎ চাওয়া নিয়ে বাকবিতণ্ডার এক পর্যায়ে জামাইকে চপেট আঘাত করায় শুরু হয় ঘটনার সূত্রপাত। প্রতিশোধপরায়ণ কৃষ্ণ বাড়ৈ (২০ আগস্ট) শ্বশুরকে প্রথমে অপহরণ করে নিকট দুরত্বের এক নির্জন জায়গায় আটকে রেখে নির্যাতন পরবর্তী হত্যা করে লাশ খালের কচুরিপনার নিচে লুকিয়ে রাখে।এরপর ওই দুগ্ধ ব্যবসায়ীর স্ত্রী বিউটি হালদার স্বামীর খোঁজ না পেয়ে ২১ আগস্ট স্থানীয় থানায় একটি জিডি দায়ের করেন। অন্যদিকে জামাতা কৃষ্ণ বাড়ৈ কিছুটা আত্মগোপনের ন্যায় চলাফেরা করলেও বিষয়টি কেউ আঁচ করতে পারেনি যে জামাতা নিজ শ্বশুরকে অপহরণের পর হত্যা করার মত নির্মমতার পথ বেছে নিতে পারে। পুলিশ তথ্যপ্রযুক্তির মাধ্যমে শ্বশুর-জামাতার লোকেশনের সূত্রপাত ধরে কৃষ্ণ বাড়ৈকে আটক করলে বেরিয়ে আসে মন্টু হত্যার আদ্যপান্ত।তবে সবচেয়ে বেশি স্যোশাল মিডিয়ায় ভাইরাল হওয়া শিরোনাম ছিল বরিশাল জেলার মুলাদীর চরে চোখ উৎপাটনের একটি ঘটনা। যা প্রাণ কেড়ে নেওয়ার চেয়ে বেশি মর্মদায়ক বলে বিবেচিত হচ্ছে। কেউ বলছে, মধ্যযুগীয় ঘটনাকেও হার মানায় উপজেলার বাহেরচর গ্রামের এই ঘটনা। ভুক্তভোগীর পরিবার জানায়, ঢাকায় কর্মরত রিপন গত ২০ আগস্ট বাড়ি ফিরে ভাইয়ের কাছে রক্ষিত অর্থ ও ২০ ভরি স্বর্ণালঙ্কার বিশেষ প্রয়োজনে ফেরত চায়। কিন্তু তা দিতে অস্বীকৃতি জানালে রিপন পেট্রোল দিয়ে বাড়ি পুড়িয়ে দেওয়ার হুমকি দেয়। এরপর বাবা আর্শেদ বেপারীর নির্দেশে তার দুই পুত্র রোকন বেপারী ও স্বপন বেপারী একাতিত্ব হয়ে নিজ ভাইকে বাড়ির উঠনে ফেলে দুই চোখ উপড়ে ফেলে।এই ঘটনার বিশেষ একটি দিক হল, এর মধ্যযুগীয় ঘটনার সময় আহত রিপন বাঁচার স্বার্থে ডাক-চিৎকার দিলেও এলাকাবাসী কেউ এগিয়ে আসেনি। এমনকি আপন স্বজনদের মনও গলেনি। পরে অবশ্য পুলিশ অভিযোগের প্রেক্ষাপটে প্রধান অভিযুক্ত স্বপন বেপারীকে গ্রেফতার করলেও পিতা ও অপর ভাই এখনও পলাতক রয়েছে বলে সর্বশেষ খবরে জানা গেছে। উল্লেখিত ঘটনা প্রবাহে প্রমাণ করে গোটা বরিশাল বিভাগে পুলিশ প্রশাসনের দুর্বলতার কারণেই অপরাধ প্রবণতা দিন পর দিন বেড়েই চলেছে। রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও সুশীল সমাজের ব্যক্তিবর্গরা বলছেন, ২০২৪ সালের পাঁচ আগস্টের পর পুলিশের নিলপ্তায় যেমন বাড়ছে মাদক বেচাকেনা, তেমনিই সামাজিক অবক্ষয় শূন্যের কোঠায় দিয়ে দাঁড়িয়েছে। সেক্ষেত্রে মাদক বিস্তারকে বেশি দায় করা হচ্ছে।অল্প দিনেই বিস্তার টাকা আয়ের সুবর্ণ সুযোগ পাওয়ায় মানবতার জায়গায় হিংসতার জন্ম হচ্ছে। যেমন মিল্টন-লিটুর ঘটনা উৎকৃষ্ট উদাহরণ হতে পারে। জনশ্রুতি রয়েছে, এই পথে অল্প দিনে অর্থশীল হওয়ার কারণে মাদকের পথ বেছে নিচ্ছে কারবারিরা। অন্যদিকে আইনশৃঙ্খলাবাহিনী অপরাধ বিস্তারের ঘটনা দেখে নিরব দর্শকের ভূমিকায় থাকছে বা বাধ্য হচ্ছে রাজনৈতিক প্রভাব বিস্তারের মুখে।রাজনৈতিক শক্তি ব্যবহারে উল্টো ফলও দেখা যায় পিরোজপুর জেলার ভাণ্ডারিয়ার উপজেলায়। এই জনপদের একটি ঘটনা উল্লেখ করা যেতে পারে। একজন নারিকেল চোর তার চৌয়শা ধরা পড়ায় শালিস বিচারে স্থানীয় বিএনপি নেতা রেজাউল কবির ঝন্টু ভূমিকা রাখায় তার খেসারত হিসেবে প্রাণ দিতে হয়। এ ঘটনা গত ২৯ আগস্ট শুক্রবার সকাল বেলা প্রকাশ্য দিবালোকেই ঘটে। ফলে আইনশৃঙ্খলার এই অবনতির প্রেক্ষাপটে মানবতাও ভুলুণ্ঠিত হয়ে গেছে। যেখানে মানবতা নেই, সেখানে আত্মীয়তার সম্পর্ক থাকে কোথায়? এ কারণেই তো মানুষের জীবন এখন স্বজনদের কাছেও নিরাপদ নয়।এসকে/আরআই
Source: সময়ের কন্ঠস্বর
