দিনাজপুরের খানসামা উপজেলায় রোগীদের স্বাস্থ্যসেবায় বিভিন্ন সময়ে ৩টি হাসপাতাল প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে। এর মধ্যে ৫০ শয্যার একটি, ২০ শয্যার একটি এবং অপরটি ১০ শয্যাবিশিষ্ট। কিন্তু এসব হাসপাতালের একটি চালু না হওয়া এবং অপর দুটিতে প্রয়োজনীয় চিকিৎসক, ওষুধ ও উপকরণ সংকটে কাঙ্খিত স্বাস্থ্যসেবা না পেয়ে ভোগান্তিতে পড়েছেন রোগীরা। রোগী ও স্বজনদের ছুটতে হচ্ছে জেলা শহরে মেডিকেল কলেজ হাসপাতালসহ বেসরকারি ক্লিনিক-ডায়াগনস্টিক সেন্টারগুলোতে। এতে চিকিৎসা ব্যয় বাড়ছে কয়েকগুণ। সবচেয়ে বেশি দুর্ভোগে পড়েছেন নিম্ন আয়ের মানুষ।জেলা পরিসংখ্যান অফিসের তথ্য অনুযায়ী (২০২২ জনশুমারী) উপজেলায় ১ লাখ ৯৭ হাজার ৪০১ জন লোকের বসবাস। তিন হাসপাতালে প্রয়োজনীয় চিকিৎসক আছেন ৮ জন। হিসেব অনুযায়ী প্রায় ২৬ হাজার রোগীর জন্য চিকিৎসক রয়েছেন একজন। স্থানীয়রা বলছেন, প্রতিষ্ঠার পর থেকেই ৫০ শয্যার হাসপাতালটিতে সাধারণ রোগের চিকিৎসা ছাড়া জটিল কোন রোগের ক্ষেত্রে কাঙ্খিত সেবা মেলেনি। সেটির মান উন্নত না করে তৎকালীন সংসদ সদস্য নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি রক্ষায় আরও দুটি স্বাস্থ্যকেন্দ্র প্রতিষ্ঠা করেছেন। ফলে সেবা পাবার বিপরীতে রোগীদের ভোগান্তির মাত্রা বেড়েছে।উপজেলার বাসিন্দারা বলছেন, সরকারি হাসপাতালগুলোর কোনো উন্নয়ন হয়নি বললেই চলে। বছরের পর বছর ধরে কেবল ভবন ও প্রকল্পের আনুষ্ঠানিকতা বাড়ানো হয়েছে। কিন্তু হাসপাতালের চিকিৎসক, নার্স, যন্ত্রপাতি, ওষুধ কিংবা অন্যান্য অবকাঠামো সেবার দিকে কোনো মনোযোগ দেওয়া হয়নি।আব্দুল হামিদ নামের এক প্রবীণ বলেন, ‘হাসপাতাল আছে ঠিকই, কিন্তু সেবা নাই। রোগী হইলে দিনাজপুর, সৈয়দপুর বা রংপুরে ছুটতে হয়। গরিব মানুষ কীভাবে করবে?’উপজেলায় প্রবেশমুখে আত্রাই নদীর পাড়ে ২০ শয্যা বিশিষ্ট হাসপাতালটি উদ্বোধন করা হয়েছে সাড়ে তিন বছর আগে। দীর্ঘ সময় পরেও কার্যক্রম শুরু হয়নি। ফলে একদিকে হাসপাতালে সরবরাহকৃত কোটি টাকার আসবাবপত্র, মেশিনারী ও ইলেকট্রিক সামগ্রী নষ্ট হতে শুরু করেছে, ঘটছে চুরির ঘটনাও। দ্রুততার সাথে এখানে সেবা কার্যক্রম চালুর দাবি স্থানীয়দের।সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, প্রায় ১৬ কোটি টাকা ব্যয়ে ‘উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স সম্প্রসারণ প্রকল্পের’ আওতায় হাসপাতালটি নির্মাণ করা হয়। ২০২০ সালে নির্মাণ কাজ শেষ করে স্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তর। কোন প্রকার জনবল নিয়োগ ছাড়াই ২০২১ সালে তৎকালীন সংসদ সদস্য হাসপাতালটি উদ্বোধন করেন। অবশ্য ২০২০ সালে করোনা রোগীদের স্বাস্থ্য ক্যাম্প করা হয়েছিলো এখানে।উপজেলা শহরে নির্মিত ২০ শয্যার হাসপাতালটি থেকে পাকেরহাট এলাকায় ৫০ শয্যাবিশিষ্ট স্বাস্থ্যকমপ্লেক্সটির দুরত্ব প্রায় ১১ কিলোমিটার। ফলে ৫০ শয্যার হাসপাতালের নিকটবর্তী আঙ্গারপাড়া, খামারপাড়া, ভাবকী গোয়ালডিহি ইউনিয়নের মানুষের সুবিধা হলেও ভোগান্তিতে পড়েছেন আলোকঝাড়ী, ভেড়ভেড়ী ইউনিয়নের বাসিন্দারা। স্থানীয়রা বলছেন, ২০ শয্যার হাসপাতালটি চালু হলে ওই দুই ইউনিয়নসহ পার্শ্ববর্তী বীরগঞ্জ, পঞ্চগড়ের দেবীগঞ্জ এবং নীলফামারী সদর উপজেলার মানুষও উপকৃত হবেন।তিন একর জমির উপরে নির্মাণ করা হয়েছে ২০ শয্যার হাসপাতালটি। রবিবার (২৪ আগস্ট) সকালে হাসপাতাল ঘুরে দেখা যায়, প্রধান ফটকে ঝুলছে তালা। ৫০ শয্যাবিশিষ্ট হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের সহায়তায় ভেতরে প্রবেশ করা গেলো। এই হাসপাতালের মূল ভবনটি দ্বিতল বিশিষ্ট। নিচতলায় চিকিৎসক ও ফার্মেসী কক্ষ, স্টোর রুম, মিটিং রুম, জেনারেল অফিস। দ্বিতীয়তলায় অস্ত্রোপচার কক্ষ, মহিলা ও পুরুষ ওয়ার্ড, কেবিন, চিকিৎসক ও নার্স কক্ষ। আসবাবপত্রসহ কক্ষগুলোতে ধুলোর আস্তর পরেছে, নষ্টের পথে অস্ত্রোপচার কক্ষের যন্ত্রপাতি।মূল ভবনের ঠিক পিছনে চিকিৎসক-নার্স-কর্মচারীদের জন্য দুটি দ্বিতল ও একটি তিনতলা আবাসিক ভবন। মাহফুজ নামের এক ব্যক্তিকে পাওয়া গেল নার্স ভবনে। তিনি ৫০ শয্যাবিশিষ্ট হাসপাতালের স্বাস্থ্য সহকারি। কয়েক মাস থেকে অফিসের নির্দেশে এখানে থাকছেন। জানালেন, ‘কয়েকদিন আগে এখান থেকে বিদ্যুতের তার চুরি হয়েছে। সন্ধ্যার পরে হাসপাতাল চত্ত্বর ঘুটঘুটে অন্ধকার থাকে। কক্ষগুলোতে এসি আছে, ফ্যানসহ মূল্যবান সরঞ্জামাদি আছে। সাম্প্রতিক সময়ে চোরের উপদ্রবও বেড়েছে। যেকোন দিন আরও বড় চুরির আশঙ্কা করছেন তিনি।হাসপাতালের সামনে দাঁড়ানো আব্দুল জলিল (৫২) নামের স্থানীয় এক ব্যক্তি বলেন, ‘হামার এইঠে থাকি বড় হাসপাতাল অনেক দূরত। কাছোত একটা হাসপাতাল হইলো হামরা মনে করনো কষ্ট কমি গেইল। কিন্তু এত টাকা খরচ করি এলা হাসপাতাল চালুই হছে না।’এই হাসপাতালটির বিষয়ে ৫০ শয্যাবিশিষ্ট হাসপাতালের স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. শফিকুর রহমান বলেন, ‘আমাদের জনবল দিয়েই হাসপাতালটি চালুর চেষ্টা করা হয়েছিলো। কিন্তু আমাদের এখানেইতো চিকিৎসক সংকট। তবে পদ সৃজনের জন্য ৪৩ জনের একটি তালিকা মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়েছে। এরই মধ্যে প্রায় ১২ লাখ টাকা শুধু বিদ্যুৎ বিল বকেয়া পরেছে হাসপাতালটির।’খানসামা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স আগে ছিল ৩১ শয্যা। চার বছর আগে এটিকে উন্নীত করা হয় ৫০ শয্যায়। কিন্তু জনবল সংকট না মিটিয়েই এই উন্নীতকরণ হয়েছে।এখানে ১৬ জন চিকিৎসক থাকার কথা থাকলেও আছেন মাত্র ৮ জন। সার্জারি, মেডিসিন, গাইনিকোলজি—সব বিভাগেই বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক নেই। অনেক পদই দীর্ঘদিন ধরে খালি। নার্স ও সহকারী কর্মচারীর সংখ্যাও পর্যাপ্ত নয়।হাসপাতালে আলট্রাসনোগ্রাম, এক্স-রে, ইসিজি, প্যাথলজি ল্যাব থাকলেও যন্ত্রপাতির বড় অংশ নষ্ট হয়ে আছে বা ব্যবহার অযোগ্য। প্রতিদিন গড়ে ৩০০–৩৫০ জন রোগী বহির্বিভাগে আসেন। ভর্তি থাকেন প্রায় ৭০–৯৫ জন রোগী। প্রতিদিন ২–৩টি স্বাভাবিক প্রসব করানো হয়।রবিবার (২৪ আগস্ট) দুপুরে হাসপাতালে গিয়ে দেখা যায়, বহির্বিভাগে দীর্ঘ লাইন। মাত্র দুইজন চিকিৎসক কয়েক ঘণ্টায় শত শত রোগী দেখছেন। স্বজনরা ভোগান্তিতে পড়ছেন।একজন রোগীর স্বজন আক্ষেপ করে বললেন, ‘ডাক্তারের জন্য ঘণ্টার পর ঘণ্টা দাঁড়ায়ে থাকতে হয়। আবার প্রেসক্রিপশনে যে ওষুধ লেখে, সেগুলা বাইরের দোকান থেকে কিনতে হয়।’জেলা সিভিল সার্জন আসিফ ফেরদৌস বলেন, এরই মধ্যে প্রায় ১২ লাখ টাকা শুধু বিদ্যুৎ বিল বকেয়া পড়েছে। তবে জনবল সংকট দূর করতে ইতিমধ্যে পদ সৃজনের জন্য ৪৩ জনের একটি তালিকা মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়েছে।২০১৬ সালে চালু হয় খানসামার ১০ শয্যার মা ও শিশুকল্যাণ কেন্দ্র। শুরু থেকেই এখানে চিকিৎসক সংকট। বর্তমানে কোনো চিকিৎসক নেই। স্বাস্থ্য সহকারী ও আয়ারাই কেন্দ্রটি চালাচ্ছেন।প্রতিদিন ৪০–৫০ জন রোগী এবং মাসে গড়ে ১২০–১৩০ জন প্রসূতি মা এখানে সেবা নিতে আসেন। কিন্তু গত আট মাস ধরে কোনো ওষুধ সরবরাহ নেই। ফলে রোগীরা স্থানীয় ক্লিনিক ও ডায়াগনস্টিক সেন্টারে ছুটছেন।স্বাস্থ্য সহকারী নাজনীন সুলতানা বলেন, ‘চিকিৎসক না থাকায় অনেক সময় আমাদের অসহায় লাগে। তবু আমরা চেষ্টা করি রোগীদের কিছুটা সেবা দিতে।’স্থানীয়দের অভিযোগ, হাসপাতালগুলো চালু করার ক্ষেত্রে রাজনীতিই বড় ভূমিকা রাখছে। ভোটের আগে বড় বড় প্রতিশ্রুতি দেওয়া হলেও নির্বাচনের পর সেগুলোর কোনো বাস্তবায়ন হয় না।নতুন হাসপাতাল উদ্বোধন করা হয়, উন্নীতকরণের ঘোষণা দেওয়া হয়। কিন্তু জনবল ও সেবার মান বাড়ানো হয় না। ফলে হাসপাতালগুলো কেবল ভবন হিসেবেই দাঁড়িয়ে আছে, মানুষের কাজে আসছে না।সরকারি হাসপাতালে কাঙ্ক্ষিত সেবা না পেয়ে মানুষ ঝুঁকছেন স্থানীয় বেসরকারি ক্লিনিক ও ডায়াগনস্টিক সেন্টারের দিকে। কিন্তু সেখানে চিকিৎসা ব্যয় অনেক বেশি। ফলে গরিব রোগীরা ঋণ নিয়ে কিংবা সম্পদ বিক্রি করে চিকিৎসা করাতে বাধ্য হচ্ছেন।দিনমুজুর শহিদুল ইসলাম বলেন, ‘সরকারি হাসপাতালে গেলে ডাক্তার নাই, ওষুধ নাই। আবার প্রাইভেটে গেলে খরচ বেশি। গরিব মানুষ কি করবে?’উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. শফিকুর রহমান বলেন, ‘আমাদের সীমিত জনবল দিয়েই চেষ্টা করছি। তবে সত্যি কথা হলো, খানসামার মানুষের চাহিদার তুলনায় বর্তমান অবস্থা অনেক পিছিয়ে। আমরা বারবার উর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানিয়েছি।’দিনাজপুরের সিভিল সার্জন আসিফ ফেরদৌস বলেন, ‘আমরা ইতোমধ্যে মন্ত্রণালয়ে জনবল সৃজনের জন্য তালিকা পাঠিয়েছি। আশা করি দ্রুত নিয়োগ হবে।’খানসামার তিনটি হাসপাতালই কার্যত জনবল ও সেবার সংকটে ভুগছে। একটি পুরোপুরি বন্ধ, অন্য দুটি আংশিকভাবে চলছে। অথচ এই হাসপাতালগুলোতেই ভরসা রাখেন লাখো মানুষ।চিকিৎসাসেবার এমন বেহাল অবস্থায় রোগীরা বাধ্য হচ্ছেন দূরের শহরে ছুটতে। এতে সময়, অর্থ ও ভোগান্তি বেড়ে যাচ্ছে। দ্রুত উদ্যোগ না নিলে খানসামার স্বাস্থ্যসেবা পরিস্থিতি আরও সংকটে পড়বে বলে মনে করছেন সচেতন মহল।এইচএ

Source: সময়ের কন্ঠস্বর

সম্পর্কিত সংবাদ
দুপুরের মধ্যে ৮০ কিমি বেগে ঝড়ের আশঙ্কা
দুপুরের মধ্যে ৮০ কিমি বেগে ঝড়ের আশঙ্কা

আবহাওয়া অফিস আশঙ্কা করছে, ঢাকাসহ দেশের ১২ অঞ্চলের ওপর দিয়ে সর্বোচ্চ ৮০ কিলোমিটার বেগে ঝড় ও বজ্রসহ বৃষ্টি হতে পারে। Read more

নিজের প্রথম পুরস্কার বাবাকে নয়, মাকে উৎসর্গ করলেন আরিয়ান
নিজের প্রথম পুরস্কার বাবাকে নয়, মাকে উৎসর্গ করলেন আরিয়ান

সদ্য অনুষ্ঠিত একটি পুরস্কার বিতরণী অনুষ্ঠানে জীবনের প্রথম পরিচালকের পুরস্কার জিতে আলোচনার কেন্দ্রে উঠে এলেন শাহরুখ খানের পুত্র আরিয়ান খান। Read more

মাগুরায় বাসের ধাক্কায় প্রাণ গেল অবসরপ্রাপ্ত পুলিশ সদস্যের
মাগুরায় বাসের ধাক্কায় প্রাণ গেল অবসরপ্রাপ্ত পুলিশ সদস্যের

মাগুরা শহরে সেন্টমার্টিন পরিবহনের একটি বাসের ধাক্কায় ফজলুর রহমান (৭৫) নামের এক অবসরপ্রাপ্ত পুলিশ সদস্য নিহত হয়েছেন। শনিবার (১৩ সেপ্টেম্বর) Read more

জীবননগরে পাখি ভ্যান থেকে পড়ে গৃহবধূর মৃত্যু
জীবননগরে পাখি ভ্যান থেকে পড়ে গৃহবধূর মৃত্যু

চুয়াডাঙ্গার জীবননগর উপজেলার কুলতলা গ্রামে পাখি ভ্যান থেকে পড়ে সামেনা বেগম (৪০) নামে এক গৃহবধূর মৃত্যু হয়েছে। মঙ্গলবার (২১ অক্টোবর) সকাল Read more

১৩ আগস্ট: নামাজের সময়সূচি
১৩ আগস্ট: নামাজের সময়সূচি

আজ বুধবার, ১৩ আগস্ট ২০২৫ ইংরেজি, ২৯ শ্রাবণ ১৪৩২ বাংলা, ১৮ সফর ১৪৪৭ হিজরি। ঢাকা ও তার পার্শ্ববর্তী এলাকার নামাজের Read more

উত্তর কোরিয়ায় নির্বাচনে ৯৯.৯৩ শতাংশ ভোট পেলেন কিম জং উন
উত্তর কোরিয়ায় নির্বাচনে ৯৯.৯৩ শতাংশ ভোট পেলেন কিম জং উন

উত্তর কোরিয়ার সর্বোচ্চ নেতা কিম জং উন আবারও প্রায় শতভাগ ভোট পেয়ে নির্বাচনে জয় পেয়েছেন। দেশটির সাম্প্রতিক পার্লামেন্ট নির্বাচনে ক্ষমতাসীন Read more

আমরা নিরপেক্ষ নই ,    জনতার পক্ষে - অন্যায়ের বিপক্ষে ।    গণমাধ্যমের এ সংগ্রামে -    প্রকাশ্যে বলি ও লিখি ।   

NewsClub.in আমাদের ভারতীয় সহযোগী মাধ্যমটি দেখুন