নওগাঁর আদিবাসী নেতা আলফ্রেড সরেন হত্যাকাণ্ডের ২৫ বছর পার হয়ে গেলেও বিচারিক প্রক্রিয়া এখনো সম্পন্ন হয়নি। ২০০০ সালের ১৮ আগস্ট নওগাঁর মহাদেবপুর উপজেলার ভীমপুর আদিবাসী পল্লিতে ভূমিদস্যুদের হামলায় নিহত হন এই আদিবাসী নেতা।আলফ্রেড সরেন হত্যা মামলার বিচারকাজ কবে শেষ হবে, শেষ পর্যন্ত তা কোথায় গিয়ে দাঁড়াবে এ নিয়ে আদিবাসীদের মধ্যে দেখা দিয়েছে সংশয়। এর ওপর অব্যাহত রয়েছে হুমকি-ধমকি। এরই মধ্যে আদিবাসীদের অনেকেই ভীমপুর আদিবাসী পল্লি ছেড়ে অন্যত্র চলে গেছেন।২০০০ সালের ১৮ আগস্ট ভীমপুর আদিবাসী পল্লিতে ভূমিদস্যু হাতেম-গদাই গংদের সন্ত্রাসীরা হামলা চালিয়ে ১১টি পরিবারের বাড়িঘর ভাঙচুর ও লুটপাট এবং অগ্নিসংযোগ করে। হামলায় আদিবাসী নারী-শিশুসহ প্রায় ৩০ জন গুরুতর আহত হন। এ সময় আদিবাসীদের কয়েকটি শিশুকে সন্ত্রাসীরা পার্শ্ববর্তী পুকুরেও ছুড়ে ফেলে।সন্ত্রাসীরা যখন আদিবাসী পল্লিতে হামলা চালায় তখন দুপুর ১২টা। দিনটি ছিল শুক্রবার। হামলার প্রতিবাদে ওই দিন জুমার নামাজের পর নওগাঁ-মহাদেবপুর সড়কের চৌমাসিয়ার মোড়ে প্রতিবাদ সমাবেশের আয়োজন করে আদিবাসীরা।আদিবাসী নেতা আলফ্রেড সরেন কর্মসূচির সব আয়োজন শেষ করে দুপুর ১২টার দিকে খাবার খেতে বাড়িতে যান। পল্লির অধিকাংশ পুরুষ তখন চৌমাসিয়ার মোড়ে সমাবেশস্থলেই ছিল।আলফ্রেড বাড়িতে যেতেই সন্ত্রাসী বাহিনী হামলা চালায়। আলফ্রেড বুঝতে পেরে নিজের ঘর ছেড়ে অন্য ঘরে আশ্রয় নেন। আলফ্রেড যে ঘরটিতে আশ্রয় নিয়েছিলেন, সন্ত্রাসীরা সেটিতে আগুন ধরিয়ে দিয়ে তাকে ঘর থেকে বেরিয়ে আসতে বাধ্য করে। তিনি ঘরের বাইরে আসামাত্র সন্ত্রাসীরা তাকে ধারালো অস্ত্র দিয়ে কুপিয়ে হত্যা করে।বর্বরোচিত এই ঘটনা পর দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের আদিবাসী জনগোষ্ঠী, প্রগতিশীল রাজনৈতিক দলসহ সচেতন মহলে ব্যাপক আলোড়ন ও ক্ষোভের সৃষ্টি হয়। আদিবাসীরা রাস্তায় নেমে প্রতিবাদ জানান।আলফ্রেড সরেন হত্যার ঘটনাকে কেন্দ্র করে আদিবাসী জনগোষ্ঠীর ওপর বিভিন্ন সময়ে পরিচালিত অত্যাচার ও নির্যাতনের বিরুদ্ধে দেশি-বিদেশি মিডিয়াসহ সর্বস্তরের মানুষ সোচ্চার হয়ে রাস্তায় নেমে আসে। আদিবাসীদের পক্ষে দেশব্যাপী ব্যাপক জনমত গঠিত হয়।এই হত্যাকাণ্ডের কয়েকদিন আগে নওগাঁর মুক্তির মোড় কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারের পাদদেশে আন্তর্জাতিক আদিবাসী দিবসে এক সমাবেশ অনুষ্ঠিত হয়। সেদিন আলফ্রেড সরেন নওগাঁর সিপিবি নেতা ময়নুল হক মুকুল, মহসীন রেজাসহ আরও কয়েকজনের কাছে আশঙ্কা প্রকাশ করেন যে তাকে হত্যা করা হতে পারে। সবাই তাকে সতর্ক থাকার পরামর্শ দিয়েছিলেন বলে জানান তৎকালীন নওগাঁ জেলা সিপিবির সভাপতি মুক্তিযোদ্ধা ময়নুল হক মুকুল।মহসীন রেজা জানান, হত্যাকাণ্ডের আগের দিন ১৭ আগস্ট আলফ্রেড মহাদেবপুর উপজেলা আওয়ামী লীগ নেতা দেওয়ান আমজাদ হোসেন তারাকে একটি চিঠি লিখেছিলেন। চিঠিতে তাকে হত্যা করতে পারে এমন সন্দেহভাজন ১০ জনের নাম উল্লেখ করা ছিল।আদিবাসীদের ডাকা চৌমাসিয়ার মোড়ে সেই সভায় সেদিন বক্তব্য দেয়ার জন্য উপস্থিত ছিলেন নওগাঁ সিপিবির তৎকালীন সভাপতি মুক্তিযোদ্ধা ময়নুল হক মুকুল।তার সঙ্গে কথা হলে তিনি বলেন, ‘তখন দুপুর সাড়ে ১২টা হবে। হঠাৎ আমার নজর চলে যায় ভীমপুর গ্রামের দিকে। ভালো করে তাকিয়ে দেখি কুণ্ডলী পাকিয়ে ধোঁয়া উঠছে। আমি সবাইকে সেটা দেখতে বলি। ইতোমধ্যে মাঠের মধ্য দিয়ে গ্রামের উদ্দেশে দৌড় দেন আদিবাসীরা। আমিও আদিবাসীদের পিছু পিছু গ্রামে গিয়ে উপস্থিত হই। ততক্ষণে সব শেষ।’তিনি আরও বলেন, ‘আমি, মহসীন রেজা, শহীদ হাসান সিদ্দিকী স্বপনসহ আরও কয়েকজনকে খবরটা জানিয়ে দেই। তবে আমার কাছে অবাক লেগেছে সেদিন পুলিশের তৎপরতা দেখে। অতি দ্রুত পুলিশ কীভাবে খবর পেয়ে সেখানে উপস্থিত হলো সেটা একটা প্রশ্ন। তখনই আমার ধারণা হয়েছিল পুলিশকে ম্যানেজ করেই ঘটনাটি ঘটিয়েছিল হাতেম-গদাই গং। পুলিশ সেখান থেকে তড়িঘড়ি করে আলফ্রেডের লাশ নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করলে আমি আদিবাসীদের সঙ্গে নিয়ে বাধা দেই। পুলিশকে বাধ্য করি লাশের ময়নাতদন্তের জন্য।’আলফ্রেড সরেন হত্যার ঘটনায় তার ছোট বোন রেবেকা সরেন বাদী হয়ে হত্যা ও জননিরাপত্তা আইনে পৃথক দু’টি মামলা করেন। মামলায় পুলিশ ৯১ আসামির নামে আদালতে চার্জশিট দেয়। এর মধ্যে পুলিশ কয়েকজন আসামিকে গ্রেপ্তার করে।ওই সময় নওগাঁ দায়রা জজ আদালতে মামলার সাক্ষ্যগ্রহণ শুরু হয় এবং ৪১ জন সাক্ষীর মধ্যে ১৩ জনের সাক্ষ্যগ্রহণ সম্পন্ন হয়েছিল। জোট সরকার ক্ষমতায় আসার পর জননিরাপত্তা আইন বাতিল করে।এরপর পলাতক শীতেষ চন্দ্র ভট্টাচার্য ওরফে গদাই (বর্তমানে প্রয়াত) ও হাতেম আলীসহ ৬০ জনের বেশি আসামি জননিরাপত্তা আইনের বিরুদ্ধে হাইকোর্টে রিট পিটিশন করলে মামলাটি হাইকোর্ট ৩ মাসের জন্য স্থগিত করে। এরপর আসামিরা জামিনে বেরিয়ে আসে।মামলার বাদীপক্ষের আইনজীবী মহসীন রেজা বলেন, ‘আলফ্রেড সরেনকে হত্যার পর তার বোন রেবেকা সরেন মহাদেবপুর থানায় হত্যা মামলা করেন। ওই মামলার তদন্ত চলাকালে আলফ্রেডের বড় ভাই জননিরাপত্তা আইনে আরেকটি মামলা করেন। পরবর্তীতে দুটি মামলা একসঙ্গে তদন্ত করে একটি অভিযোগপত্র দেয়া হয়।’তিনি আরও বলেন, ‘নওগাঁ জেলা জজ আদালতে মামলার বিচার কার্যক্রম শুরু হলে আসামিরা জননিরাপত্তা আইনের বিরুদ্ধে হাইকোর্টে রিট করে। পরবর্তীতে এই রিটগুলো খারিজ হয়ে গেলে আলফ্রেড হত্যার বিচার কার্যক্রম চলতে থাকে। আসামিরা হাইকোর্টে রিটের খারিজের আদেশের বিরুদ্ধে আপিলেট ডিভিশনে মোকদ্দমা আনে।’তিনি বলেন, ‘আপিলেট ডিভিশনে সে মোকদ্দমা শুনানি শেষে আপিল ডিভিশনের বিচারক পুনরায় সেই রিটগুলো শুনানির জন্য হাইকোর্টে পাঠান। রিটগুলো হাইকোর্টে শুনানির জন্য অপেক্ষমাণ রয়েছে। আর আলফ্রেড হত্যার বিচার কার্যক্রম বর্তমানে নওগাঁর দায়রা জজ আদালতে স্থগিত অবস্থায় রয়েছে।বিষয়টি নিয়ে আলফ্রেড সরেন হত্যা মামলার বাদী ও আলফ্রেডের ছোট বোন রেবেকা সরেন বলেন, ‘২০০০ সালের ১৮ আগস্ট আমার ভাইকে ভূমিদস্যুরা নির্মমভাবে চাইনিজ কুড়াল ও রামদা দিয়ে কুপিয়ে হত্যা করে। এই হত্যাকাণ্ডের নেপথ্যে ছিলেন হাতেম ও গদাই।’এই হত্যার ঘটনায় থানায় একটি মামলা করেন রেবেকা সরেন এবং তার বড় ভাই জননিরাপত্তা আইনে আরেকটি মামলা করেন। এই ঘটনার সময় যে পরিবারগুলো বসবাস করত তারা মামলার সাক্ষী হওয়ায় তাদেরকে মেরে ফেলার হুমকি দেয়া হতো বলেও জানান রেবেকা।রেবেকা বলেন, ‘২০১২ সালে আমার ছোট ভাইকেও একইভাবে মেরে ফেলার চেষ্টা করা হয়। তারা এখনও আমাদের ওপর বিভিন্নভাবে হুমকি দিয়ে যাচ্ছে। আর মাথা উঁচু করে ঘুরে বেড়াচ্ছে। যে জমির জন্য আমার ভাইকে হত্যা করা হয়েছে, সে জমিগুলোও তারা দখল করে খাচ্ছে।’কান্নাজড়িত কণ্ঠে তিনি বলেন, ‘আমার ভাইকে হত্যার পর মা-বাবা পাগলের মতো হয়ে যান। সেভাবেই তারা মারা গেছেন। হত্যাকাণ্ডের ২২ বছর পরও আমরা বিচার পাইনি। বিচার পাব কি না তা নিয়েও আমরা সংশয়ে আছি। একটি স্বাধীন দেশে আমরা কখনও এমনটা ভাবতে পারিনি। যারা আমার ভাইকে হত্যা করেছে তাদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দাবি জানাচ্ছি।’আদিবাসী অধিকার কর্মী আজাদ হোসেন মুরাদ বলেন, ‘আলফ্রেড সরেন আদিবাসী সম্প্রদায়ের অধিকার আদায়ের জন্য কাজ করতেন। ভূমিদস্যুদের হামলায় তিনি নিহত হন। এই হত্যাকাণ্ডের বিচার আজও সম্পন্ন হয়নি, যা নিয়ে আদিবাসী সংগঠন ও স্থানীয়দের মধ্যে ক্ষোভ ও হতাশা রয়েছে। অভিলম্বে আলফ্রেড হত্যার বিচার দাবি করছি।’আরডি
Source: সময়ের কন্ঠস্বর
