দিনাজপুরের খানসামা উপজেলার আলোকঝাড়ি ইউনিয়নের বাসুলী এলাকায় আত্রাই নদীর বুকজুড়ে ভেসে থাকা ছোট্ট গ্রাম মাঝিয়ালির চর। চারপাশে সবুজ বন, নদীর স্রোতের মৃদু ঢেউ আর পাখির কূজন দেখতে এটি যেন শান্তির একটি কোণ। এ যেন প্রকৃতির এক নিখুঁত উপহার। কিন্তু এই স্বর্গীয় দৃশ্যের আড়ালে লুকিয়ে আছে চরবাসীর কঠিন জীবন।মাঝিয়ালির চরে মোট ১৩টি পরিবার বসবাস করে। শীত ও গ্রীষ্মে জীবন কিছুটা স্থিরভাবে চলে। এই পরিবারগুলো চাষাবাদ, পশুপালন ও ছোটখাটো ব্যবসার মাধ্যমে জীবনযাপন করে। কিন্তু বর্ষার আগমনে সবকিছু থমকে যায়। নদীর পানি বেড়ে গেলে পুরো চর পানিবন্দি হয়ে পড়ে। বাজারে যাওয়া, বিদ্যালয়ে যাওয়া, হাসপাতালে চিকিৎসা—সবই হয়ে যায় এক ধরনের সংগ্রাম।আহসান হাবিব, এই চরের একজন বাসিন্দা, বলেন, ‘বর্ষায় আমাদের জীবন যেন থেমে যায়। অসুস্থ মানুষ থাকলেও আমরা চিকিৎসা নিতে পারি না। শিশুদের স্কুলে যাওয়া দেরিতে হয় বা অনেক সময় মোটেই সম্ভব হয় না। আমাদের নিজস্ব নৌকা থাকলে এই কষ্ট অনেকটাই কমে যেত।’মাঝিয়ালির চরের স্থানীয় বাসিন্দা আব্দুল লতিফ বলেন, ‘৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের পর থেকেই এখানে বসবাস শুরু করেছি। বর্ষার দিনে আমরা পুরোপুরি বিচ্ছিন্ন হয়ে যাই। চিকিৎসা, বাজার বা জরুরি কাজ—সবই দেরিতে বা অসম্ভব হয়ে পড়ে। অন্যের নৌকা ভাড়া করতে হয়, কিন্তু সব সময় পাওয়া যায় না। আমাদের জন্য বর্ষা সবচেয়ে বড় ভোগান্তি।’এই চরের বাসিন্দা সোহেল ইসলাম বলেন, ‘আমরা (আবদুল লতিফ, আহসান হাবিব ও আমার পরিবার) প্রতিটি বর্ষায় একরকম ভোগান্তির মধ্যে দিন কাটাই। শিশুদের স্কুলে যাওয়া, বাজারে যাওয়া, হাসপাতালে চিকিৎসা—সবই কঠিন হয়ে যায়। বর্ষার দিনে নৌকা না থাকলে জীবন একেবারে থেমে যায়। যদি আমাদের নিজস্ব নৌকা থাকত, তবে এই কষ্ট অনেকটা কমে যেত।’চরের মানুষদের দিন কাটে এমন ভঙ্গিতে। বর্ষার সময় শিশুদের স্কুলে যেতে না পারা, অসুস্থ মানুষদের চিকিৎসা থেকে বঞ্চিত হওয়া, বাজারে যাওয়া—সবই যেন প্রতিদিনের পরীক্ষা।আলোকঝাড়ি ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান খলিলুর রহমান জানান, ‘এর আগে তাদের জন্য একটি নৌকা দেওয়া হয়েছিল, তবে সেটি এখন ব্যবহার অনুপযোগী। ইউএনও মহোদয়ের নির্দেশে নতুন নৌকা তৈরির কাজ শুরু হয়েছে। আশা করি দ্রুত সমস্যার সমাধান হবে।’উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) কামরুজ্জামান সরকার বলেন, ‘মাঝিয়ালির চরের যাতায়াত সমস্যা সম্পর্কে জানার পরে জরুরি পরিস্থিতিতে যেন তারা নৌকায় যাতায়াত করতে পারে, সে বিষয়ে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। আমরা চাই এই চরবাসীর জীবন সহজ হোক এবং কোনো ব্যক্তি বা পরিবার যেন বর্ষার পানিতে নিঃসঙ্গ না থাকে।’আরডি
Source: সময়ের কন্ঠস্বর
