চট্টগ্রামের বোয়ালখালী উপজেলার শ্রীপুর–খরণদ্বীপ ও চরণদ্বীপ ইউনিয়নবাসীর স্বপ্ন ছিল সৈয়দ খালের উপর একটি স্থায়ী সেতু হবে। ৪৩ মিটার দৈর্ঘ্যের এ সেতুটি নিয়ে প্রকল্প হাতে নেয় স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তর (এলজিইডি)। কিন্তু কাজ শুরুর চার বছর পেরিয়ে গেলেও সেতুটি এখনো দাঁড়ায়নি পূর্ণাঙ্গ কাঠামোয়। বরং দফায় দফায় ঠিকাদার পরিবর্তন, ব্যয় বৃদ্ধি এবং অনিয়মের অভিযোগে প্রকল্পটি এখন দুর্নীতি ও দীর্ঘসূত্রতার প্রতীকে পরিণত হয়েছে।এলজিইডি সূত্রে জানা যায়, ২০২০–২১ অর্থবছরে কালুরঘাট–ভান্ডালজুড়ি সড়কের কেরানী বাজার এলাকায় সেতুটির নির্মাণকাজ শুরু হয়। প্রথমে ‘ACNT-JV’ নামের একটি প্রতিষ্ঠানকে ৩ কোটি ৬৬ লাখ টাকায় কাজের দায়িত্ব দেওয়া হয়। চুক্তি অনুযায়ী ২০২২ সালের অক্টোবরের মধ্যে সেতু শেষ হওয়ার কথা থাকলেও প্রতিষ্ঠানটি নির্মাণসামগ্রীর মূল্যবৃদ্ধির অজুহাতে কাজ অসমাপ্ত রেখেই চলে যায়।পরবর্তীতে ২০২৪–২৫ অর্থবছরে নতুন করে ‘মেসার্স নুর সিন্ডিকেট’ নামের প্রতিষ্ঠানের হাতে প্রকল্পের দায়িত্ব দেওয়া হয়। এ সময় ব্যয় বেড়ে দাঁড়ায় প্রায় ৪ কোটি ৫৬ লাখ টাকা। কিন্তু চলতি বছরের জুন পর্যন্ত প্রকল্পের অগ্রগতি মাত্র ৪৫ শতাংশ। অর্থাৎ ব্যয় বাড়লেও কাজের গতি নেই বললেই চলে।প্রকল্পের কাজ চলাকালীন সময়ে স্থানীয়দের চলাচলের জন্য অস্থায়ী কাঠের সাঁকো নির্মাণ করা হয়েছিল। সেটিই ছিল দুই ইউনিয়নের হাজারো মানুষের ভরসা। কিন্তু সাম্প্রতিক বৃষ্টিপাত ও জোয়ারের স্রোতে ভেঙে গেছে সেই সাঁকোও। ফলে এখন শিক্ষার্থী থেকে শুরু করে কৃষক, রোগীসহ সব শ্রেণির মানুষ পড়েছে চরম দুর্ভোগে।স্থানীয় বাসিন্দা জামাল উদ্দিন বলেন, ‘প্রতিদিন ৩ কিলোমিটার ঘুরে বিকল্প পথে হেঁটে আমাদের ছেলেমেয়েদের স্কুল-কলেজে যেতে হয়, অথচ সেই পথটিও ভাঙাচোরা। কৃষিপণ্য বাজারে নিতে গেলে লোকসান গুনতে হয়। অসুস্থ রোগী হাসপাতালে নিতে গেলে জীবন ঝুঁকির মধ্যে পড়ে।’এই প্রসঙ্গে জানতে চাইলে শ্রীপুর–খরণদ্বীপ ইউনিয়ন পরিষদের প্যানেল চেয়ারম্যান মো. হাসান চৌধুরী সময়ের কন্ঠস্বরকে বলেন, ‘কাঠের সাঁকো ভেঙে পড়ায় মানুষের কষ্টের সীমা নেই। দ্রুত সংস্কারের উদ্যোগ নেওয়ার জন্য আমরা কর্তৃপক্ষকে জানিয়েছি।’বোয়ালখালী উপজেলা এলজিইডির উপ–সহকারী প্রকৌশলী মো. ফারুক হোসেন বলেন, ‘বৃষ্টি এবং জোয়ারের পানিতে বিকল্প সেতু ভেঙে গেছে। ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের সহায়তায় দ্রুত মেরামত করা হবে।’প্রকল্পটি নিয়ে স্থানীয়দের ক্ষোভ এখন তীব্র। তারা অভিযোগ করছেন, ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের অবহেলা, পর্যাপ্ত তদারকির অভাব এবং দুর্নীতির কারণে সেতুর কাজ আটকে আছে। একই প্রকল্পে কয়েক বছরের ব্যবধানে কোটি কোটি টাকা অতিরিক্ত বরাদ্দ হলেও দৃশ্যমান অগ্রগতি নেই।স্থানীয়রা প্রশ্ন তুলেছেন–যদি প্রথম প্রতিষ্ঠান কাজ অসমাপ্ত রেখে চলে যায়, তাহলে তাদের বিরুদ্ধে কেন ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি? নতুন প্রতিষ্ঠানের হাতে কাজ দিয়ে কেন ব্যয় আরও বাড়ানো হলো? আর তদারককারী কর্তৃপক্ষ কেন দায় এড়াচ্ছেন?চার বছর ধরে কোটি কোটি টাকা ব্যয়ের প্রতিশ্রুতি দেওয়া হলেও বাস্তবে সেতু এখনো অপূর্ণ স্বপ্ন। উন্নয়নের নামে বরাদ্দকৃত অর্থের সদ্ব্যবহার হয়নি– বরং প্রকল্পটি দুর্নীতি, অপচয় ও অনিয়মের নতুন দৃষ্টান্ত তৈরি করেছে।কৃষক, শিক্ষার্থী, দিনমজুর থেকে শুরু করে সাধারণ গ্রামীণ মানুষ–সবাই আজ জিম্মি হয়ে পড়েছে এক সেতুর আশায়। বর্ষায় কাদায় আটকে থাকে জীবনযাত্রা, শুষ্ক মৌসুমে ধুলোয় ভোগে মানুষ। অথচ কাগজে-কলমে ব্যয়ের অঙ্ক দিন দিন ফুলে-ফেঁপে উঠছে।এআই
Source: সময়ের কন্ঠস্বর
