র্যাগিং, শৃঙ্খলাভঙ্গ, উচ্ছৃঙ্খল আচরণ এবং জুলাই গণঅভ্যুত্থানের সময় শেখ হাসিনার গণহত্যার উসকানি, শিক্ষক ও শিক্ষার্থী নির্যাতনের অভিযোগে বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ে (বাকৃবি) ২৪৫ জন শিক্ষক, শিক্ষার্থী, কর্মকর্তা ও কর্মচারীকে শাস্তি দিয়েছে প্রশাসন। শনিবার (১৬ আগস্ট) বাকৃবির নতুন প্রশাসনের এক বছরের কার্যক্রম বিশ্লেষণ করে এই তথ্য পাওয়া গেছে।যাদের মধ্যে জুলাই গণঅভ্যুত্থানে নিরীহ শিক্ষক, শিক্ষার্থী, কর্মকর্তা ও কর্মচারী নির্যাতন এবং গত বছর ৪ আগস্ট শান্তি মিছিলে যোগদানের অভিযোগে ১৩৩ জন, আশরাফুল হক হলে র্যাগিংয়ের অভিযোগে ২১ জন শিক্ষার্থী, তাপসী রাবেয়া হলে র্যাগিংয়ের দায়ে ৫ জন শিক্ষার্থী, হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী হলে প্রথম বর্ষের শিক্ষার্থীদের র্যাগিংয়ের দায়ে ২৭ জন শিক্ষার্থী, জুলাই ৩৬ হলে শৃঙ্খলাভঙ্গের দায়ে ১৫ জন শিক্ষার্থী, নাজমুল আহসান হলে ফুল চুরির অভিযোগে ৩ জন শিক্ষার্থী এবং শাহজালাল হলে প্রথম বর্ষের ফিস্ট অনুষ্ঠানে আওয়ামী প্রচারণামূলক স্লোগান বাজানোর অভিযোগে ৪১ জন শিক্ষার্থীকে শাস্তি দিয়েছে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন।বিশ্ববিদ্যালয় সূত্রে জানা যায়, গত বছর জুলাই-আগস্টে ছাত্র-জনতার আন্দোলনের মাধ্যমে সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার শাসনের পতন হলে দেশের বিভিন্ন সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের মতো বাকৃবিতেও উপাচার্য ও প্রশাসনের পদ পরিবর্তন হয়। নতুন প্রশাসনের দায়িত্ব গ্রহণের পর বিশ্ববিদ্যালয়ে সুষ্ঠু শিক্ষা ও গবেষণার পরিবেশ নিশ্চিতের লক্ষ্যে এসব শাস্তি দেওয়া হয়।বাকৃবিতে আশরাফুল হক হলে র্যাগিংবাকৃবির আশরাফুল হক হলে চার শিক্ষার্থীকে ছাত্রদল ও শিবির ট্যাগ দিয়ে র্যাগিংয়ের অভিযোগে ১৫ জন শিক্ষার্থীর ডিগ্রির সনদ বাতিল এবং ৩ জন শিক্ষার্থীকে বিশ্ববিদ্যালয় থেকে আজীবনের জন্য বহিষ্কার করা হয়। এ ছাড়া ২ জন শিক্ষক (১ জনকে নিম্নপদে অবনমন এবং অন্যজনকে পদন্নতি ও বেতন বৃদ্ধি স্থগিত) এবং ১ জন কর্মকর্তাকে চাকরি থেকে অপসারণ করা হয়। সম্প্রতি বিশ্ববিদ্যালয়ের সিন্ডিকেটের ৩২৮ তম সভায় এ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।শাস্তির অভিযোগ পত্র থেকে জানা যায়, বাকৃবির আশরাফুল হক হলে ২০২২ সালের ১৩ ডিসেম্বর সন্ধ্যা ৬টা হতে রাত ১টা পর্যন্ত চারজন শিক্ষার্থীকে ছাত্রদল এবং শিবির ট্যাগ দিয়ে গেস্ট রুমে এবং হলের বিভিন্ন কক্ষে বিভিন্ন গ্রুপে বিভক্ত হয়ে মারাত্মকভাবে শারীরিক নির্যাতন করে। প্রথমে তাদেরকে আহত অবস্থায় একটি লকারের মধ্যে তালাবদ্ধ করে রাখা হয়। পরবর্তীতে মাঝরাতে তাদেরকে হলের বাইরে ফেলে দেওয়া হয় এবং একজন শিক্ষার্থীকে মোটর সাইকেলে করে বিশ্ববিদ্যালয় হেলথ কেয়ার সেন্টারে রেখে আসা হয়।তাপসী রাবেয়া হলে র্যাগিংবাকৃবির তাপসী রাবেয়া হলে কৃষি অনুষদের প্রথম বর্ষের শিক্ষার্থী তাসনোভা হককে র্যাগিংয়ের অভিযোগে তিন নারী শিক্ষার্থী বহিষ্কার এবং দুই জনকে অর্থদণ্ড দেয় বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন। একজন শিক্ষার্থীকে ১২ মাসের জন্য হল থেকে বহিষ্কার এবং দুই জনকে ৬ মাসের জন্য হল থেকে বহিষ্কার করা হয়। বিশ্ববিদ্যালয়ের “অর্ডিন্যান্স ফর স্টুডেন্ট ডিসিপ্লিন” এর ৭ নং ধারা অনুসারে অভিযুক্তদেরকে সাময়িকভাবে হল থেকে বহিষ্কার করা হয়।এই বিষয়ে তাপসী রাবেয়া হলের প্রভোস্ট অধ্যাপক ড. ইসরাত জাহান শেলী জানান, ভুক্তভোগী নারী শিক্ষার্থীকে র্যাগিংয়ের উদ্দেশ্যে ৩১ মে রাত পৌনে ২ টার দিকে ওই তিন শিক্ষার্থী ছাদে ডাকে। পরে সে ছাদে যেতে রাজি না হলে তাকে বারান্দায় ডেকে নিয়ে রাত সাড়ে ৪টা পর্যন্ত মানসিক নির্যাতন করা হয়। মেয়েটি দুর্বল হৃদয়ের ছিল। সে তাদের বারবার বলছিল ছেড়ে দেওয়ার জন্য, না হয় হার্ট অ্যাটাক করতে পারে। তবে তারা তাকে নির্যাতন থেকে বিরত রাখেনি। পরদিন ভোরে মেয়েটি ভয়ে বাড়ি চলে যায়। তদন্তে অভিযোগ প্রমাণিত হলে তাদের শাস্তিস্বরূপ হল থেকে সাময়িকভাবে বহিষ্কার করা হয়।হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী হলে র্যাগিংবাকৃবির হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী হলে ২০২৩-২৪ শিক্ষাবর্ষের নবীন শিক্ষার্থীদের গেস্টরুমে র্যাগিংয়ের অভিযোগে ২৭ জন শিক্ষার্থীকে এক বছরের জন্য হল থেকে বহিষ্কার করা হয়। বহিষ্কৃতদের মধ্যে সোহরাওয়ার্দী হলের লেভেল-১, সেমিস্টার-২, লেভেল-২, সেমিস্টার-২ এবং একজন মাস্টার্সের শিক্ষার্থী রয়েছেন।বিশ্ববিদ্যালয় সূত্র জানা যায়, র্যাগিংয়ের উদ্দেশ্যে নবীন শিক্ষার্থীদের রাত ৯টায় সোহরাওয়ার্দী হলের টিভি রুমে ডাকা হয়। এরপর প্রথম ও দ্বিতীয় বর্ষের কয়েকজন শিক্ষার্থী তাদের অকথ্য ভাষায় গালিগালাজ করে এবং বিভিন্ন অদ্ভুত শাস্তি দেয়। এসব শাস্তির মধ্যে ছিল ১০ রকমের হাসি দেওয়া, ১০ রকমের সালাম দেওয়া, গাছে ঝুলে থাকার অভিনয়, নাচ করা ইত্যাদি। এমন পরিস্থিতিতে ভীত হয়ে এক নবীন শিক্ষার্থী অসুস্থ হয়ে পড়লে তাকে হাসপাতালে নেওয়া হয়। শাস্তির মেয়াদ শেষ হওয়ায় তাদের মধ্যে অনেকজন হলে অবস্থান করছেন।জুলাই ৩৬ হলে ১৫ ছাত্রী বহিষ্কারবাকৃবির ‘জুলাই ৩৬ হল’-এ উচ্ছৃঙ্খল আচরণ ও শৃঙ্খলা ভঙ্গের দায়ে ১৫ ছাত্রীকে বহিষ্কার করে প্রশাসন। বহিষ্কৃতদের মধ্যে একজনকে আজীবনের জন্য হল থেকে বহিষ্কার, ৪ জনকে দুই একাডেমিক সেমিস্টারের জন্য শিক্ষা কার্যক্রম ও হল থেকে বহিষ্কার, ২ জনকে এক সেমিস্টারের জন্য শিক্ষা কার্যক্রম এবং দুই সেমিস্টারের জন্য হল থেকে বহিষ্কার, ৬ জনকে এক সেমিস্টারের জন্য শিক্ষা কার্যক্রম ও হল থেকে বহিষ্কার এবং ২ জনকে শুধুমাত্র এক সেমিস্টারের জন্য হল থেকে বহিষ্কার করা হয়।বিশ্ববিদ্যালয় সূত্রে জানা যায়, গত ৯ জানুয়ারি তৎকালীন ফজিলাতুন্নেছা মুজিব (বর্তমান জুলাই ৩৬ হল) হল নাম বহাল রাখার দাবিতে ওই হলের নারী শিক্ষার্থীরা রাত ৯টা থেকে ১টা পর্যন্ত বিক্ষোভ মিছিল করে। এছাড়া কয়েকজন শিক্ষার্থী সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে প্রাধ্যক্ষ ও প্রক্টরের পদত্যাগ দাবি করে আপত্তিকর পোস্ট ও মন্তব্য করে। যা বিশ্ববিদ্যালয়ের সুনাম ক্ষুণ্ন হওয়ার অভিযোগ এনে তা আমলে নেয় প্রশাসন। তদন্তে অভিযোগ প্রমাণিত হওয়ায় তাদের শাস্তি দেওয়া হয়।নাজমুল আহসান হলে ফুল চুরি, জরিমানাশহীদ নাজমুল আহসান হল থেকে ফুল চুরি করে ভক্তি কুটির ইসকন মন্দিরে পূজার বস্তু হিসেবে ব্যবহার করায় তিন শিক্ষার্থীকে শাস্তি দেওয়া হয়। এ ঘটনায় বিশ্ববিদ্যালয়ের শৃঙ্খলাবিধির ৭ নং ধারা অনুযায়ী শহীদ নাজমুল আহসান হলের একজন শিক্ষার্থীকে জরিমানা এবং দুই শিক্ষার্থীর ছাত্রত্ব না থাকায় হল থেকে বের করে দেওয়া হয়।বিশ্ববিদ্যালয় সূত্রে জানা যায়, তারা সকালের দিকে হল থেকে তিন বস্তা ফুল চুরি করে। এরপর গার্ডরা হল প্রভোস্টকে জানালে দুপুরের দিকে হাতে হাতে ধরা হয়। অভিযুক্তদের মধ্যে একজন শহীদ নাজমুল আহসান হলের এবং অপর ২ জন শহীদ শামছুল হক হলের।শাহজালাল হলে আওয়ামী প্রচারণা স্লোগানগত বছরের ২৬ ডিসেম্বর বাকৃবির শাহজালাল হলের ১ম বর্ষের শিক্ষার্থীদের হল ফিস্ট অনুষ্ঠানে আওয়ামী লীগের নির্বাচনী প্রচারণামূলক গান বাজানোর ঘটনায় একজনকে এক বছরের জন্য হল থেকে বহিষ্কার এবং ১ম বর্ষের প্রায় ৪০ জন শিক্ষার্থীকে জনপ্রতি ৫০০ টাকা জরিমানা করা হয়। বিশ্ববিদ্যালয়ে অস্থিরতা সৃষ্টির অভিযোগে তাদের এই শাস্তি দেওয়া হয়।জুলাই গণঅভ্যুত্থানে শান্তি মিছিলে যোগদান এবং শিক্ষক ও শিক্ষার্থী নির্যাতনগতবছর ৪ আগস্ট ‘শেখ হাসিনাতেই আস্থা’ শান্তি মিছিলে যোগদান এবং গণ অভ্যুত্থান চলাকালীন বিশ্ববিদ্যালয়ের নিরীহ শিক্ষক ও শিক্ষার্থীদের ওপর জুলুম ও নির্যাতনের অভিযোগে ১৩৩ জন শিক্ষক-শিক্ষার্থী, কর্মকর্তা ও কর্মচারীকে শাস্তি দেয় বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন। যাদের মধ্যে ৫৭ জন শিক্ষক, ২৪ জন কর্মকর্তা, ২১ জন কর্মচারী এবং ৩১ জন শিক্ষার্থী রয়েছেন। বিশ্ববিদ্যালয়ের সিন্ডিকেটের ৩২৮ তম সভায় এ সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়েছে।শিক্ষকদের মধ্যে ৬ জনকে বরখাস্ত, ১২ জনকে অপসারণ, ৮ জনকে নিম্নপদে অবনমন এবং ৩১ জনকে তিরস্কারের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। কর্মকর্তাদের মধ্যে ৮ জনকে বহিষ্কার, ৮ জনকে অপসারণ, ৭ জনকে তিরস্কার এবং ১ জনকে ৫ লাখ টাকা অর্থদণ্ড প্রদানের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। কর্মচারীদের মধ্যে ২ জনকে বরখাস্ত এবং ১৯ জনকে তিরস্কারের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। শিক্ষার্থীদের মধ্যে ৭ জনকে আজীবন বহিষ্কার এবং ২৪ জনের সনদপত্র বাতিলের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রকাশিত বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, বিগত ৪ আগস্ট ২০২৪ তারিখে বাকৃবি ক্যাম্পাসে ছাত্রলীগ বহিরাগতদের নিয়ে পূর্বপরিকল্পিতভাবে “শান্তি মিছিল” নামে একটি সন্ত্রাসী মিছিল আয়োজন করে। এই মিছিলে “শেখ হাসিনাতেই আস্থা” এবং “ঘরে ঘরে খবর দে, এক দফার কবর দে”—এই ধরনের উসকানিমূলক ও সহিংস স্লোগান দিয়ে তারা খুনি ও ফ্যাসিস্ট শেখ হাসিনার জুলুম, নির্যাতন ও গণহত্যার পক্ষে প্রচারণা চালায়। এ সময় নিরীহ ছাত্র ও শিক্ষকদের ওপর হামলা চালিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ে নজিরবিহীন ভীতিকর পরিস্থিতি সৃষ্টি করা হয়, যা শিক্ষা ও গবেষণার পরিবেশকে মারাত্মকভাবে বিঘ্নিত করে এবং চলমান বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনেও প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করে। এছাড়া, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুক, মেসেঞ্জার ও হোয়াটসঅ্যাপে বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনে অংশগ্রহণকারী ছাত্র-শিক্ষকদেরকে ভয়ভীতি ও হুমকি প্রদান করে। তাদের বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন চিহ্নিত করে শাস্তি প্রদান করেছে।এআই
Source: সময়ের কন্ঠস্বর
