কক্সবাজারের উখিয়া রোহিঙ্গা অধ্যুষিত এলাকা হওয়ায় দীর্ঘদিন ধরে প্রভাবশালী দালালচক্রের সহায়তায় রোহিঙ্গাদের ভোটার তালিকায় অন্তর্ভুক্তির গুঞ্জন ছিল। চক্রের মূলহোতারা এতটাই শক্তিশালী ছিল যে, এসব অনিয়ম প্রায় ধরা-ছোঁয়ার বাইরে থেকে যেত এবং প্রকাশ হতো না তথ্য। উখিয়া থেকে শুরু করে সারা বাংলাদেশে রয়েছে তাদের একটি বিশাল নেটওয়ার্ক। তবে, এনআইডি সংগ্রহের পর ভোটার তালিকায় অন্তর্ভুক্তি হলে উন্মোচিত হয় তথ্য। ‘সময়ের কণ্ঠস্বর’ প্রতিবেদকের অনুসন্ধানে তেমনই কয়েকটি চাঞ্চল্যকর তথ্য উঠে এসেছে।কুতুপালং রেজিস্টার্ড ক্যাম্পের রোহিঙ্গা সোনা মিয়া ও ফিরোজা খাতুনের ছেলে জামাল মোটা অঙ্কের টাকা দিয়ে চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ড থেকে বাংলাদেশি এনআইডি সংগ্রহ করে ভোটার তালিকায় নাম অন্তর্ভুক্ত করেছে (যার এনআইডি নং: ৩৭২৭৭৬৪৭৪২)। অথচ জামাল ও তার পূর্বপুরুষ সবাই মিয়ানমারের নাগরিক এবং তারা কুতুপালং রেজিস্টার্ড ক্যাম্পেই বসবাস করেন।এনআইডি ব্যবহার করে এই রোহিঙ্গা জামাল ব্যাংক হিসাব খোলা, দীর্ঘদিন ধরে ব্যবসা-বাণিজ্যসহ নানা ধরণের নাগরিক সুবিধা ভোগ করে আসছে। এ ব্যাপারে স্থানীয় প্রশাসন ও সংশ্লিষ্ট দপ্তরের কোনো তদারকি ছিল না।কুতুপালং ০৯নং ওয়ার্ডের স্থানীয় ইউপি সদস্য হেলাল উদ্দিন জানান, ‘জামাল যে রোহিঙ্গা এবং রেজিস্টার্ড ক্যাম্পের বাসিন্দা—এটি আমি জানি। তবে আমার ওয়ার্ড বা উখিয়া উপজেলা থেকে সে ভোটার হয়নি। কোথা থেকে করেছে, তা জানলে খতিয়ে দেখতাম। তাদের দুই ভাই বাজারে ব্যবসা করে শুনেছি।’কুতুপালং বাজার কমিটির সাধারণ সম্পাদক মোহাম্মদ আলি জানান, ‘জামালের একটি মোবাইল শপ ছিল, তবে এখন ওই শপে দেখা যায় না। শুনেছি ভোটার হয়েছে, তবে কোথা থেকে বা কিভাবে, তা জানি না।’অনেক চেষ্টা করেও জামালের সন্ধান না পাওয়ায় তার বক্তব্য নেওয়া সম্ভব হয়নি।অন্যদিকে, উখিয়ার রাজাপালং ইউনিয়নের হরিণমারা এলাকার মনু মিয়া ও নুর নাহার বেগমের ছেলে হাবিবুল্লাহ—এই নাম ও ঠিকানা ব্যবহার করে ২০১৭ সালে রোহিঙ্গা আব্দুল জাব্বার ও রমিদার ছেলে জুবাইর এনআইডি সংগ্রহ করে ভোটার তালিকায় অন্তর্ভুক্ত হয়।জুবাইরের কাছে জানতে চাইলে সে জানায়, ‘আমার বাবা-মা রোহিঙ্গা, কিন্তু আমি বাংলাদেশে জন্মেছি। আমি শুধু ফাইল জমা দিয়েছি, বাকি কাগজপত্রের বিষয়ে জানি না।’অন্যদিকে হাবিবুল্লাহ বলেন, ‘আমি দীর্ঘদিন বিদেশে ছিলাম। জানি না কীভাবে আমার নাম ও বাবা-মায়ের নাম ব্যবহার করে রোহিঙ্গা ব্যক্তি ভোটার হয়েছে। দেশে ফিরে নিজে ভোটার হতে আবেদন করলে বিষয়টি জানতে পারি আমি।’স্থানীয়দের অভিযোগ, মোটা অঙ্কের বিনিময়ে কিছু ইউপি সদস্য ও গ্রাম পুলিশ গোপনে এসব কাজে সহযোগিতা করছে। তবে, সরাসরি কেউ এই কাজে জড়িত হয় না।স্থানীয় সরোয়ার আলম শাহীন বলেন, ‘এসব ঘটনা প্রতিনিয়ত ঘটছে। ধরা না পড়লে কোনো ব্যবস্থা নেই, আর ধরা পড়লেও মূল দালালচক্রের বিরুদ্ধে পদক্ষেপ নেওয়া হয় না। এসব বিষয়ে কেউ তদন্ত করেও দেখে না। এসব গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে খতিয়ে দেখা দরকার এসব অবৈধ কাজের পিছনে কে বা কারা রয়েছে। মূল জায়গায় হাত দিলেই বন্ধ হবে এসব।’রাজাপালং ইউনিয়ন পরিষদের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান মীর শাহেদুল ইসলাম রোমান জানান, ‘ঘটনা সত্য। আমরা শুনে প্রাথমিকভাবে রোহিঙ্গা জুবাইরের আইডি কার্ড জব্দ করেছি এবং নির্বাচন অফিসে চিঠি দেওয়ার প্রক্রিয়া চলছে। তবে ঘটনা ঘটেছে আগের চেয়ারম্যানের সময়ে।’উখিয়া উপজেলা নির্বাচন অফিসার মিজানুর রহমান সময়ের কণ্ঠস্বর-কে বলেন, ‘কয়েকটি ঘটনার বিষয়ে আমরা অবগত হয়েছি। উপজেলার বাইরে যারা এনআইডি করেছে, তাদের বিষয়ে উর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের সাথে আলোচনা করা হবে। তবে রোহিঙ্গা জুবাইরের বিষয়টি উপজেলা-কেন্দ্রিক হওয়ায় স্থানীয় চেয়ারম্যান আমাদের জানিয়েছেন। আমরা বিষয়টি নিয়ে সমাধানের প্রক্রিয়া চালাচ্ছি। প্রতারণার বিষয়টি উর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানিয়ে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’এইচএ
Source: সময়ের কন্ঠস্বর
