রাজশাহীর বাঘা উপজেলার চকরাজাপুর ইউনিয়নে চলমান বন্যায় কৃষি ও জনজীবনে মারাত্মক প্রভাব পড়েছে। পুরো এলাকা পানির নিচে চলে যাওয়ায় অনেকেই বাধ্য হয়ে গলা পর্যন্ত পানিতে নেমে কাঁচা ধান কাটছেন কৃষকরা। গত চারদিনের টানা বন্যায় এই ইউনিয়নের অধিকাংশ কৃষিজমি তলিয়ে গেছে। এতে জলমগ্ন হয়ে পড়েছে প্রায় ৬০০ পরিবার।স্থানীয়দের তথ্য মতে, উনিয়নের পলাশী ফতেপুর গ্রামের ২০০টি, কালিদাসখালীর ২০০টি, আতারপাড়ার ১০০টি এবং চৌমাদিয়া ও দিয়াড়কাদিরপুরের আরও ১০০টি বাড়ি পানিতে ডুবে গেছে। এছাড়াও চকরাজাপুর উচ্চ বিদ্যালয়সহ আশপাশের প্রায় ৫০টি পরিবার পদ্মা নদীর ভাঙনের ঝুঁকিতে রয়েছে। ইউনিয়নের ৫০ বিঘা পেয়ারাবাগান, ৩০০ বিঘা কাউন, ৪০০ বিঘা আউস ধান, ২০০ বিঘা ভুট্টা, ৫০০ বিঘা পেঁপে এবং ২০০ বিঘা কলাবাগান পানির নিচে তলিয়ে গেছে।কৃষক সমশের আলী জানান, ২৫ হাজার টাকা বিঘা হিসেবে জমি ইজারা নিয়ে পাঁচ বিঘা আউস ধান চাষ করেছিলেন। প্রতি বিঘায় খরচ হয়েছে প্রায় ৫ হাজার টাকা করে। এখন সেই ধান পাকার আগেই পানিতে ডুবে গেছে। তাই কাঁচা অবস্থায় গরুর খাদ্য হিসেবে ব্যবহার করতে বাধ্য হচ্ছেন। তিনি বলেন, ‘কাঁচা ধান গরুর জন্য কেটে নিচ্ছি, এবার আমরা কী খেয়ে বাঁচব, এই চিন্তায় মরে যাচ্ছি।সরেজমিনে দেখা যায়, শ্রমিকরা গলা পানি থেকে সেই ধান কাটছেন। স্থানীয় কৃষক আরিফুল জানাল, ‘এক-তৃতীয়াংশ ধান পাওয়া যাবে। শ্রমিক ভাড়া করে ধান কাটা হচ্ছে, কিন্তু তা থেকে লাভ তো দূরের কথা, খরচই উঠবে না।’ এরই মধ্যে লক্ষ্মীনগর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের বেড়ার অর্ধেক পানিতে ডুবে গেছে। ফলে বিদ্যালয় বন্ধ ঘোষণা করেছে কর্তৃপক্ষ। পানির কারণে চরের ৯টি প্রাথমিক বিদ্যালয় ও দুটি উচ্চ মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা স্কুলে যেতে পারছে না। এর মধ্যে চৌমাদিয়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় পুরোপুরি পানিতে ডুবে গেছে।স্থানীয় বাসিন্দা চনকা মিস্ত্রির স্ত্রী সালমা বেগম জানান, পানিতে রান্নাবান্না অসম্ভব হয়ে পড়েছে। আশেপাশের বাড়ি থেকে রান্না করা খাবার এনে খেতে হচ্ছে। মুরগি ও অন্যান্য গৃহপালিত প্রাণীও পানির কারণে সমস্যায় পড়েছে।বাঘা উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা শফিউল্লাহ সুলতান জানান, ‘উপজেলার প্রায় ৭৮ হেক্টর জমির ফসল ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। আমাদের বিভাগ থেকে কৃষকদের ক্ষতিপূরণ দেওয়ার কোনো ব্যবস্থা নেই।’বাঘা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) শাম্মী আক্তার বলেন, ‘আমরা অফিসিয়ালি প্রায় ২২০টি পরিবারের পানিবন্দি হওয়ার তথ্য পেয়েছি। আগামীকাল (বুধবার) তাদের মাঝে ১০ কেজি করে চাল বিতরণ করা হবে।’চকরাজাপুর ইউনিয়ন পদ্মা নদীর মাঝে অবস্থিত হওয়ায় প্রতি বর্ষায় এই ইউনিয়নের মানুষ ঝুঁকির মুখে পড়ে। জানা গেছে, মঙ্গলবার (১২ আগস্ট) দুপুর ১২টায় পদ্মার পানি রেকর্ড করা হয় ১৭ দশমিক ৪৪ মিটার। যা বিপৎসীমার খুবই কাছাকাছি। পানি বৃদ্ধি পেয়ে প্রতিটি চরের বাড়ির উঠান দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। গরু-ছাগল নিয়ে চরের মানুষ পড়েছে চরম সংকটে।চৌমাদিয়া চরের ইউপি সদস্য আবদুর রহমান বলেন, ‘পদ্মার মধ্যে ১৫টি চরের আয়তন ৪৬ কিলোমিটার। জনসংখ্যা সাড়ে ১৫ হাজার, বসবাস করছে প্রায় সাড়ে ৩ হাজার মানুষ। নিজের সব জমিই ভাঙনে গেছে। এখন নিরুপায় হয়ে চরে জীবনযাপন করছি।’উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা শাম্মী আক্তার জানান, ‘চরের মানুষের দুর্দশার বিষয়ে আমরা অবগত। জেলা প্রশাসককে জানিয়েছি, বরাদ্দ পেলে দ্রুত সহায়তা দেওয়া হবে।’আরডি
Source: সময়ের কন্ঠস্বর
