কক্সবাজারের চকরিয়া থানার সেকেন্ড অফিসার ফজলে রাব্বি ইশান-এর বিরুদ্ধে প্রকাশ্য ঘুষ বাণিজ্যের চাঞ্চল্যকর অভিযোগ উঠেছে। স্থানীয়দের দাবি, থানার ভেতরে নিজের কক্ষে বসেই তিনি মামলার আসামি, জামিনপ্রার্থী কিংবা মামলার বাদী-পক্ষ থেকে মোটা অঙ্কের টাকা নেন। এসব অবৈধ অর্থের একটি অংশ নাকি নিয়মিতভাবে থানার অফিসার ইনচার্জের কাছেও যায়।সম্প্রতি প্রতিবেদকের হাতে আসা একটি ভিডিও ফুটেজে দেখা গেছে, একটি নির্দিষ্ট মামলার আসামিপক্ষ থানায় প্রবেশ করে সরাসরি সেকেন্ড অফিসার ইশানের কক্ষে যায়। কক্ষে ঢোকার সঙ্গে সঙ্গেই ইশান আসামিপক্ষকে কঠোর ভঙ্গিতে হুমকি ও ভর্ৎসনা করতে থাকেন। তার রূঢ় ভাষা ও ভীতি প্রদর্শনে আতঙ্কিত হয়ে আসামিপক্ষ কয়েকবার অনুনয়-বিনয় করে। একপর্যায়ে, ভীতসন্ত্রস্ত অবস্থায় আসামিপক্ষ জামার ভেতর থেকে হাজার টাকার নোটের একটি মোটা বান্ডেল বের করে ইশানের হাতে গুঁজে দেয়। টাকা গ্রহণ করার পর কোনো কথা না বলে বান্ডেলটি টেবিলের ড্রয়ারে গোপনে রেখে দেন।ভিডিওতে টাকা প্রদানকারী ব্যক্তিকে বলতে শোনা যায়, ‘স্যার আমি গরীব মানুষ, টাকা কম নেন।’ পুরো ঘটনাটি ভিডিওতে স্পষ্টভাবে দৃশ্যমান, যা ঘুষ বাণিজ্যের প্রমাণ হিসেবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।স্থানীয়দের অভিযোগ, চার্জশিট থেকে নাম বাদ দেওয়া, জামিনযোগ্য ধারা দেওয়ার শর্তে বা তদন্তে অনুকূল রিপোর্ট পেতে ইশান নিয়মিত ঘুষ নেন। কখনো সরাসরি, আবার কখনো দালালের মাধ্যমে টাকা হাতবদল হয়। এমনকি থানায় নাকি মামলার অগ্রগতি বা গতি পরিবর্তনের প্রতিটি ধাপের জন্য নির্দিষ্ট ‘রেট লিস্ট’ চালু আছে। দীর্ঘদিন ধরে এই ঘুষ লেনদেন চললেও ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের দৃশ্যমান কোনো ব্যবস্থা না নেওয়ায় এলাকায় ক্ষোভ ও প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে।স্থানীয়দের মতে, বর্তমান ওসি মো. শফিকুল ইসলাম যোগদানের পর থানায় একটি প্রভাবশালী সিন্ডিকেট গড়ে ওঠে, যার আর্থিক লেনদেনের মূল দায়িত্বে আছেন সেকেন্ড অফিসার ইশান। জানা গেছে, আওয়ামী লীগ সরকার পতনের পর ডিএমপি থেকে বদলি হয়ে তিনি চকরিয়া থানায় আসেন। এরপর এসআই সোহরাব সাকিব ও এএসআই পারভেজ-কে নিয়ে থানার নিয়ন্ত্রণ নিজের হাতে নেন। মামলা বাণিজ্য থেকে শুরু করে চাঁদাবাজি পর্যন্ত তাদের প্রভাব বিস্তার ঘটে।অনেকেই ইশানকে চকরিয়া থানার ‘অঘোষিত ওসি’ হিসেবে উল্লেখ করেন। থানার ভেতরের কথিত প্রচলিত ধারণা হলো- ওসিও তার কথার বাইরে কোনো সিদ্ধান্ত নেন না, চকরিয়া থানার কর্মকাণ্ডের প্রায় সবকিছুই ইশানের নিয়ন্ত্রণে থাকে। এক সাব-ইন্সপেক্টরও স্বীকার করেছেন- ইশানের পছন্দ না হলে যেকোনো কর্মকর্তাকে বদলি করতেও দ্বিধা করেন না তিনি।স্থানীয় এক আইনজীবী নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, মামলায় নাম বাদ দিতে হলে বা চার্জশিটে ‘ক্লিনচিট’ নিতে হলে ফজলে রাব্বি ইশান নির্ধারিত হারে টাকা দিতে হয়। সেকেন্ড অফিসার ফজলে এলাহি নিজের ভাগ রেখে বাকিটা থানার ওসির কাছে পৌঁছে দেন বলে থানার ভেতরেই কথা প্রচলিত রয়েছে।স্থানীয় এক ব্যবসায়ী বলেন, চকরিয়া থানায় টাকা ছাড়া কোনো কাজ হয় না- এটা এখন সবার জানা কথা। মামলা করতে গেলে, অভিযোগ নিতে গেলে, এমনকি একটি সাধারণ জিডি করাতে চাইলে আগে টাকা ধরিয়ে দিতে হয়। না দিলে হয়রানি আর দৌড়ঝাঁপের শেষ থাকে না।এক ভুক্তভোগী পরিবারের সদস্য বলেন, আমরা ন্যায়বিচারের জন্য থানায় গিয়েছিলাম, কিন্তু সেখানে গিয়ে মনে হয়েছে টাকা ছাড়া কিছুই সম্ভব নয়। প্রতিটি পদক্ষেপে টাকা দাবি করে, যেন আইন-শৃঙ্খলা নয়, টাকার ক্ষমতাই সেখানে বড় কথা।ঘুষ গ্রহণের অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে সেকেন্ড অফিসার ইশান বলেন, ‘কারো কাছে টাকা নেওয়ার কোনো প্রশ্নই আসে না।’ তবে প্রতিবেদকের হাতে থাকা টাকা লেনদেনের ভিডিও ফুটেজের বিষয়ে দৃষ্টি আকর্ষণ করা হলে তিনি সরাসরি কোনো মন্তব্য না করে বিষয়টি এড়িয়ে যান। এ বিষয়ে জানতে চেয়ে চকরিয়া থানার বর্তমান ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. শফিকুল ইসলামকে যোগাযোগ করলে তিনি জানান, থানায় এমন কোনো ঘটনা তার জানা নেই। তিনি বলেন, ভিডিওটি পাঠালে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।কক্সবাজার জেলা জজকোর্টের আইনজীবী এডভোকেট আব্দুল মান্নান বলেন, পুলিশ বিভাগে এমন আচরণ নিয়ে উদ্বিগ্ন স্থানীয় সুশীল সমাজ। তার দাবি, যারা অপরাধ দমন করবে, তারাই যদি ঘুষের বিনিময়ে অপরাধীদের আড়াল করে, তাহলে আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা দুরূহ হয়ে পড়ে।কক্সবাজার জেলা পুলিশের মুখপাত্র জসিম উদ্দিন জানান, এ বিষয়ে এখনও কেউ অভিযোগ করেননি। অভিযোগ এলে অবশ্যই আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হবে।এসকে/আরআই
Source: সময়ের কন্ঠস্বর
