মুন্সীগঞ্জের সিরাজদীখান উপজেলা ইসলামিক ফাউন্ডেশনের সাবেক ফিল্ড সুপারভাইজার মো. কামাল উদ্দিনের বিরুদ্ধে অনিয়ম, দুর্নীতি ও যাকাত ফান্ডের টাকা আত্মসাতের অভিযোগ উঠেছে। গণশিক্ষা কেন্দ্রের শিক্ষক-শিক্ষিকাদের উত্তোলন করা লাখ লাখ টাকা তিনি ভরেছেন নিজের পকেটে। এছাড়া কেন্দ্র পরিবর্তনের কথা বলে ঘুষ নিয়ে হাতিয়েছেন নগদ টাকাও।জানা যায়, উপজেলার সদ্য সাবেক ফিল্ড সুপারভাইজার মো. কামাল উদ্দিন ২০২৪ সালের জুন মাসের শুরুতে উপজেলার ৯৪ জন গণশিক্ষা শিক্ষকের কাছ থেকে সরকারি যাকাত ফান্ডে জমা দেওয়ার কথা বলে শিক্ষকদের কাছ থেকে ৩ হাজার ও শিক্ষিকাদের কাছ থেকে ৫ হাজার টাকা করে নিয়েছেন। এভাবে তিনি মোট ৩ লাখ ২১ হাজার টাকা তোলেন। ২০২৪ সালের ৯ জুনে মাত্র ২৩ হাজার টাকা সিরাজদীখান সোনালী ব্যাংক শাখার সরকারি যাকাত একাউন্টে জমা দেন। বাকি টাকা আত্মসাৎ করার অভিযোগ রয়েছে।এছাড়া অসুস্থ অবস্থায় উপজেলা মডেল মসজিদের সাবেক মুয়াজ্জিন মরহুম মাওলানা শোয়াইব হোসাইনের চিকিৎসার নামে জেলা জুড়ে শিক্ষক ও ইমামদের মাধ্যমে প্রায় ৩ লাখ টাকা সংগ্রহ করেন। কিন্তু মুয়াজ্জিনের মৃত্যুর পর তার পরিবারকে ৭০ হাজার টাকা সহায়তা প্রদান করে বাকি টাকা নিজেই হাতিয়ে নিয়েছেন।আরো জানা যায়, গত ১৭ বছর ধরে আওয়ামী লীগের দলীয় প্রভাব খাটিয়ে মুন্সীগঞ্জ জেলার সাবেক মাস্টার ট্রেইনার মুফতি সরোয়ার জেলার ৬টি উপজেলার প্রভাব খাটায়। আর মাস্টার ট্রেইনার মুফতি সরোয়ারের ভয় দেখিয়ে সাবেক ফিল্ড সুপারভাইজার মো. কামাল উদ্দিন ঘুষের মাধ্যমে গণশিক্ষা কেন্দ্র বরাদ্দ, কেন্দ্র নবায়ন, নিয়োগ বাণিজ্য, ভুয়া কেন্দ্র দখল, যাকাত ও কুরবানির পশুর চামড়ার মূল্য আত্মসাৎসহ বিভিন্ন অনিয়ম করে আসছিলেন। এতে প্রায় ১৪৯ জন শিক্ষক-শিক্ষিকার কাছ থেকে যাকাতের নামে প্রায় ৪ লাখ টাকা সংগ্রহ করে সামান্য অংশ সরকারি হিসাবে জমা দিয়ে বাকি টাকা আত্মসাৎ করতেন। তাছাড়া মহামারী করোনা ভাইরাসের সময় প্রতি মসজিদে ইমামদের জন্য সরকারিভাবে পাঁচ হাজার টাকা করে অর্থ বরাদ্দ দেয় সরকার। সেই টাকাও তার ব্যক্তিগত কিছু ইমামদের দিয়ে বাকি টাকা আত্মসাৎ করেন।নাম প্রকাশ না করার শর্তে একজন শিক্ষক জানান, শিক্ষক মুহাম্মদ খাইরুল ইসলামের কাছ থেকে কেন্দ্র দেওয়ার আশ্বাসে ৫ হাজার টাকা নেন সাবেক ফিল্ড সুপারভাইজার কামাল। কিন্তু পরবর্তীতে ওই শিক্ষককে আর কেন্দ্র দেননি। মিজানুর রহমান নুরীকে প্রাক-প্রাথমিক থেকে সহজ কোরআন শিক্ষা দেওয়ার কথা বলে ১০ হাজার টাকা নেন। কিন্তু পরে আর পরিবর্তন করে দেননি। এছাড়া অনেক নারী শিক্ষকদের কাছ থেকেও বিভিন্ন সময় বিভিন্ন কথা বলে অনেক টাকা নিয়েছে। তারা আশা করেন সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ এই বিষয়গুলো তদন্ত করবেন এবং দায়িত্বশীল পদক্ষেপ গ্রহণ করবেন যাতে জনগণের আস্থা অটুট থাকে এবং সুশিক্ষার পরিবেশ বজায় থাকে।গণশিক্ষার শিক্ষক নাসিমা বেগম বলেন, ২০২৪ সালে আমি যাকাতের জন্য ৫ হাজার টাকা দিয়েছি। এছাড়া, মসজিদ নির্মাণ, মাদরাসা নির্মাণ ইত্যাদি নানা কথা বলে ফিল্ড সুপারভাইজার কামাল সাহেব আমাদের কাছ থেকে টাকা নিতেন।অপর শিক্ষক নাজমা আক্তার বলেন, আমি ব্যক্তিগতভাবে ৫ হাজার টাকা যাকাতের অর্থ দিয়েছি। পাশাপাশি বিভিন্ন অজুহাত দিয়ে ১৫০০-২০০০ টাকা করে নিতেন। আমরা নারী হওয়ায় তখন কিছু বলতে পারতাম না।কাজীবাড়ি জামে মসজিদের ইমাম ও গণশিক্ষার শিক্ষক মাওলানা মো. হারুন অর রশিদ বলেন, আমি কেন্দ্র পরিবর্তনের জন্য আবেদন করেছিলাম। তখন ফিল্ড সুপারভাইজার কামাল উদ্দিন আমার কাছ থেকে ১০ হাজার টাকা দাবি করেছিল। আমি অনেক কষ্টে ওই টাকা দিয়েছি। তারপরও বহু ঘুরাফেরার পর ইসলামিক ফাউন্ডেশনের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের মাধ্যমে আমার কেন্দ্র পরিবর্তন করতে পেরেছি। কিন্তু কামাল উদ্দিন টাকা নিয়েও আমার কেন্দ্র পরিবর্তন করেনি। তিনি একজন জঘন্য ব্যক্তি।এছাড়া ২০২৪ সালের যাকাতের টাকাও তিনি আত্মসাৎ করেছেন, যেখানে আমরা শিক্ষকরা চার হাজার থেকে পাঁচ হাজার টাকা করে জমা দিই। আরও অনেক শিক্ষককে চাকরি দেয়ার নামে ১০ থেকে ২০ হাজার টাকা করে নিয়েছে। কামাল দীর্ঘদিন ধরে সিরাজদীখান থেকে লাখ লাখ টাকা আত্মসাৎ করেছে এবং সরকারের প্রতি তাঁর বিরুদ্ধে যথাযথ ব্যবস্থা গ্রহণের দাবি জানাচ্ছি।সাধারণ কেয়ারটেকার মাওলানা মো. নেওয়াজ বলেন, ২০২৪ সালের যাকাতের টাকা শিক্ষকরা তুলে ফিল্ড সুপারভাইজার কামাল উদ্দিনের কাছে দিয়েছেন। কয়েকজন শিক্ষক টাকা সরাসরি একাউন্টে জমা দিয়েছেন, কিন্তু বাকি সবাই কামাল উদ্দিনের হাতে টাকা দিয়েছেন। এই টাকার বিষয়ে আমরা কিছু বলতে পারি না, কারণ এ সংক্রান্ত সঠিক তথ্য কামাল উদ্দিনই দিতে পারবেন।উপজেলা সাবেক ফিল্ড সুপারভাইজার মো. কামাল উদ্দিন অভিযোগ অস্বীকার করে বলেন, আমি কোনো টাকা আত্মসাৎ করিনি। আমি শিক্ষকদের কাছ থেকে কোনো টাকা নেইনি। আমি এ উপজেলা থেকে অন্য উপজেলায় যাওয়ার সময় সব ধরনের নথিপত্র মুন্সীগঞ্জ জেলা অফিসে জমা দিয়েছি।ফিল্ড সুপারভাইজার মো. কামাল উদ্দিনের কাছে কেন্দ্র পরিবর্তন, বিভিন্ন মসজিদ-মাদ্রাসা নির্মাণ, মৃত্যুবরণ করা এক সাবেক মুয়াজ্জিনের পরিবারকে দেওয়ার নামে টাকা উত্তোলন এবং যাকাতের টাকা আত্মসাৎ সংক্রান্ত অভিযোগ নিয়ে জানতে চাইলে তিনি এসব প্রশ্নের সরাসরি উত্তর না দিয়ে বলেন, ‘ভাই, আপনার সঙ্গে দেখা করব, আপনি আমার বিরুদ্ধে নিউজ লিখবেন না।’ এ সময় তিনি বারবার সংবাদ প্রকাশ না করার জন্য অনুরোধ জানান।বর্তমান ফিল্ড সুপারভাইজার আব্দুল হালিম বলেন, ২০২৪-২৫ অর্থবছরের যাকাতের ১ লাখ ১৩ হাজার টাকা ব্যাংকে রয়েছে। সেই টাকার ব্যাংক স্টেটমেন্ট আমরা উত্তোলন করেছি এবং জেলা অফিসকে জানিয়েছি। তবে ২০২৩-২৪ অর্থবছরের যাকাতের কোনো হিসাব আমাদের কাছে নেই। নগদ টাকা হয়তো জেলা অফিসে দেওয়া হয়েছে। সে বিষয়ে জেলা অফিসই বলতে পারবে, কারণ আমাদের কাছে কোনো তথ্য বা নথি নেই।মুন্সীগঞ্জ ইসলামিক ফাউন্ডেশনের উপ-পরিচালক মো. শাহাবুদ্দিন বলেন, ২০২৪ সালের যাকাতের বিষয়ে আমার কাছে কোনো তথ্য নেই, কারণ আমি সম্প্রতি এই জেলায় যোগদান করেছি। আমি উপজেলা ফিল্ড সুপারভাইজারের কাছে ব্যাংক স্টেটমেন্টসহ সব ধরনের নথি চাইব। সেগুলো পর্যালোচনা ও যাচাই-বাছাই করে যদি প্রমাণিত হয়, তবে সাবেক ফিল্ড সুপারভাইজার কামাল উদ্দিনের বিরুদ্ধে যথাযথ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) শাহীন আক্তার বলেন, ২০২৪ সালের যাকাতের টাকার হিসাব জানতে আমি বর্তমান ফিল্ড সুপারভাইজারের কাছে চেয়েছি। যদি তারা এ বিষয়ে সঠিক হিসাব দিতে ব্যর্থ হয়, তবে বিষয়টি আমার ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানাব এবং তারা যথাযথ ব্যবস্থা গ্রহণ করবেন। তিনি আরো বলেন, সাবেক ফিল্ড সুপারভাইজার মো. কামাল উদ্দিনের বিরুদ্ধে যে সব অভিযোগ রয়েছে, সে বিষয়ে একটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হবে। তদন্ত কমিটির রিপোর্ট হাতে পেলেই ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে অবহিত করে তার বিরুদ্ধে যথাযথ ব্যবস্থা নেওয়া হবে।এসআর
Source: সময়ের কন্ঠস্বর
