সরকারি কর্মকর্তা হিসেবে কর্মরত মেহেরপুরের গাংনী উপজেলার প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা (পিআইও) মনসুর রহমানের বিরুদ্ধে একের পর এক প্রকল্পের অর্থ আত্মসাতের অভিযোগের পর এবার আলোচনায় এসেছে তার নিজের গ্রামের বাড়ি নিয়ে। তার পৈতৃক ভিটা পাবনার সাঁথিয়া উপজেলার নাগডেমরা ইউনিয়নের প্রত্যন্ত গ্রাম ভিটাপাড়ায়। যেখানে হঠাৎ করেই মাথা তুলে দাঁড়িয়েছে চারতলা বিলাসবহুল এক ভবন। সাধারণ পরিবার থেকে মাত্র চার বছরের ব্যবধানে আধুনিক রাজকীয় বাড়ির মালিক হয়ে ওঠার রহস্য এলাকায় নানা প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে।অনুসন্ধানে জানা গেছে, পিআইও মনসুর রহমানের বাবা আব্দুর রহমান একজন মাছ বিক্রেতা ও মৌসুমি কৃষক ছিলেন। জীবিকার তাগিদে শুষ্ক মৌসুমে কৃষিকাজ ও বর্ষায় মাছ বিক্রি করেই সংসার চালাতেন তিনি। আব্দুর রহমানের তিন পুত্রের মধ্যে মেজ ছেলে মিলন রাজমিস্ত্রীর কাজ করেন এবং ছোট ছেলে মকসেদ আলী মেরিন ইঞ্জিনিয়ারিংয়ে পড়াশোনা করলেও বর্তমানে বেকার।স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, আব্দুর রহমানের নিজস্ব কোনো বাড়ি ছিল না। পরে স্থানীয় ইসমাইল হোসেন নামের এক ব্যক্তির পালিত মেয়েকে বিয়ে করেন এবং তার ৫ শতাংশ জমির ওপর বসবাস শুরু করেন। কিন্তু গত কয়েক বছরে দৃশ্যপট নাটকীয়ভাবে বদলে যায়। ২০২১ সালে হঠাৎ করেই ওই ৫ শতাংশ জমি ছাড়াও আরও ৩ শতাংশ জায়গা কিনে মোট ৮ শতাংশ জমির ওপর শুরু হয় একটি বহুতল ভবনের নির্মাণ। স্থানীয়রা জানান, ৪ তলা বিশিষ্ট প্রায় ৪৮০০ স্কয়ার ফিটের বাড়িটি এখন নির্মাণের শেষ পর্যায়ে রয়েছে। বাড়ির গঠনশৈলী ও খরচ দেখে এলাকাবাসীর মধ্যে নানা প্রশ্নের উদ্ভব হয়েছে, বিশেষ করে যিনি কয়েক বছর আগেও মাছ বিক্রি করে জীবিকা নির্বাহ করতেন, তার এই উত্থান কীভাবে সম্ভব?তিন প্রকল্পে কোটি টাকার দুর্নীতি গাংনী উপজেলার প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা (পিআইও) মনসুর রহমানের বিরুদ্ধে তিনটি বড় সরকারি প্রকল্পের অন্তত সাড়ে ৫ কোটি টাকার অনিয়মের অভিযোগ পাওয়া গেছে। ভুয়া প্রকল্প, জাল কাগজপত্র, ঘুষ আদায় ও নিয়মবহির্ভূত অর্থ উত্তোলনের মাধ্যমে তিনি এই বিপুল পরিমাণ অর্থ আত্মসাৎ করেছেন। জানা গেছে, ২০২৪-২৫ অর্থবছরে গাংনী উপজেলায় টিআর, কাবিখা ও কাবিটা প্রকল্পে মোট বরাদ্দ ছিল প্রায় সাড়ে ৫ কোটি টাকা। কাবিটা কর্মসূচির ৭৮টি প্রকল্পে বরাদ্দ ২ কোটি ৪০ লাখ, টিআর প্রকল্পে ১২৫টি প্রকল্পে ২ কোটি ১৬ লাখ এবং কাবিখা প্রকল্পে ১৩৬ মেট্রিক টন চাল ও গম বরাদ্দ দেওয়া হয়, যার বাজারমূল্য প্রায় ৯০ লাখ টাকা। অভিযোগ রয়েছে, এসব প্রকল্পের বেশিরভাগ কাজ না করেই ১ম ও ২য় কিস্তির সম্পূর্ণ টাকা তুলে নেন পিআইও মনসুর। ৩য় কিস্তির টাকা উত্তোলনের চেষ্টা করলে ইউএনও’র হস্তক্ষেপে তা বন্ধ করা হয়।পিআইসি সভাপতিদের অভিযোগ, মাত্র ৫ হাজার টাকা দিয়ে স্বাক্ষর নিয়ে প্রকল্পের পুরো টাকা তুলে নিয়েছেন মনসুর রহমান। নিয়ম বহির্ভূতভাবে অফিসের কর্মচারীদেরও পিআইসি সভাপতি করা হয়েছে।ইকো পার্কে ২৪.৫০ লাখ টাকার কাজ ‘কাগজে’, বাস্তবে কিছুই নেই তথ্য বলছে, ২০২৪-২৫ অর্থবছরে অবকাঠামো রক্ষণাবেক্ষণ (টিআর) কর্মসূচি আওতায় উপজেলা সাহারবাটি ইউনিয়নের ভাটপাড়া ডিসি ইকোপার্কে শিশু পার্কে রাইড স্থাপন, ফেপিং করণ ও রংকরণ বাবদ বরাদ্দ ২ লক্ষ ৫০ হাজার টাকা, পার্কে ওয়াশরুম সংস্কার ও পিকনিক সেড মেরামত বাবদ বরাদ্দ ৩ লক্ষ ৫০ হাজার টাকা, পার্কে অস্থায়ী দোকান সেড নির্মাণ বাবদ বরাদ্দ ৩ লক্ষ ৫০ হাজার টাকা। এবং ২০২৪-২৫ অর্থবছরে অবকাঠামো রক্ষণাবেক্ষণ (কাবিটা) কর্মসূচি আওতায় ডিসি ইকোপার্কের শিশুপার্ক থেকে বধ্যভূমি পর্যন্ত কাজলার পাড় এইচবিবি করণ ও দোকানের সামনের মাঠে মাটি ভরাট করণ বাবদ বরাদ্দ ৮ লক্ষ টাকা, পার্কের প্রধান গেট নির্মাণ ও গেটের পাশের মাটি ভরাট করণ বাবদ ৭ লক্ষ টাকা বরাদ্দ দেওয়া হলেও কাজ না করেই অর্থ উত্তোলন করে নেওয়া হয়েছে।সরজমিনে দেখা যায়, ইকো পার্কের ভিতর উন্নয়নমূলক প্রকল্পের কোন কাজই করা হয়নি। অথচ প্রকল্পে কাজের মেয়াদ শেষ হয়েছে গত ৩০ শে জুনের মধ্যে। এইচবিবি করণ কাজ সামান্য অংশ করা হলেও ব্যবহার হয়েছে নিম্নমানের সামগ্রী। সর্বমোট ২৪ লক্ষ ৫০ হাজার টাকার বরাদ্দের এই কাজে হরিলুট করে উত্তোলনকৃত অর্থ নিজের পকেটে ঢুকিয়েছেন উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা (পিআইও) মনসুর রহমান।পিআইসি (প্রকল্প কমিটি) সভাপতি ও ইউপি সদস্য জরিমন নেছা বলেন, ‘কাজের বিষয়ে আমি জানি না তবে মিথ্যা বলবো না, আমাকে স্বাক্ষর নিয়ে ৫ হাজার টাকা স্যার (পিআইও) দিয়েছেন, আর কিছু টাকা দেবে কিনা তাও জানি না।’বিলাসবহুল চারতলা বাড়ি নিয়ে প্রশ্নের মুখে পিআইও স্থানীয়রা জানান, চাকরিতে যোগদানের পর পিআইও মনসুর রহমান চোখের পলকে আঙুল ফুলে কলাগাছ হয়ে উঠেছেন। সরকারি প্রকল্পের টাকা নয়ছয় করে অঢেল সম্পদ গড়েছেন তিনি। এর মধ্যে নিজের গ্রাম নাগডেমরা ইউনিয়নের ভিটাপাড়া এলাকায় ৮ শতাংশ জমির ওপর নির্মাণ করেছেন রাজপ্রাসাদসদৃশ ভবন।অভিযোগের সত্যতা যাচাই করতে বৃহস্পতিবার (৮ আগস্ট) বিকেলে সরেজমিনে ভিটাপাড়া গ্রামে যান সময়ের কণ্ঠস্বরের প্রতিবেদক। কিন্তু দূর থেকে পিআইও মনসুরের ওই বাড়ির ছবি তুলতে গেলেই বাধার মুখে পড়েন তিনি। বাড়ির আশপাশে পাহারায় ছিলেন পরিবারের সদস্যরা। সাংবাদিককে দেখে তারা এগিয়ে এসে জেরা শুরু করেন, কেন ছবি তোলা হচ্ছে, কে তিনি? একপর্যায়ে শারীরিকভাবে আক্রমণেরও চেষ্টা করা হয়। পরিস্থিতি আঁচ করতে পেরে প্রতিবেদক তাৎক্ষণিকভাবে কৌশলে নিজের পরিচয় গোপন করেন এবং স্থানীয়দের সহায়তায় এলাকা ত্যাগ করেন।জানা গেছে, পিআইও মনসুরের ভয়ে প্রকাশ্যে এলাকার কেউ কথা বলতে পারেন না। এক প্রতিবেশী বলেন, চাকরি হয়েছে ৫-৬ বছর আগে। এরপর বিভিন্ন বিষয় নিয়ে পারিবারিক অশান্তি হয়েছে। আমরাই পরে সমাধান করে দিয়েছি। এখন হঠাৎ করে এলাকায় চারতলা বাড়ি। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক আরেক প্রতিবেশী জানান, সে তো মাত্র কয়েক বছর হলো চাকরিতে ঢুকেছে। আগে পরিবারে টানাটানির কথা শোনা যেত। এখন হঠাৎ রাজকীয় বাড়ি, এতে সন্দেহ তো হবেই।স্থানীয় একজন জনপ্রতিনিধি বলেন, এই অঞ্চলে কেউ যদি ৮ শতাংশ জমির ওপর এমন রাজকীয় ভবন নির্মাণ করেন, তার পেছনে পর্যাপ্ত আয় বা ব্যবসার ভিত্তি থাকার কথা। কিন্তু এমন কিছু আমরা জানি না।স্থানীয়রা জানান, শুনেছি বর্তমানে গাংনীতে বিপুল টাকা আর্থিক অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে। মনসুর এর আগে দিনাজপুরের বোঁচাগঞ্জ উপজেলায় পিআইও ছিলেন। সেখানেও তার বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগ উঠেছিল। যা নিয়ে সংবাদমাধ্যমে নিউজ হয়েছে।এই ঘটনাকে ঘিরে এলাকাজুড়ে চলছে তীব্র আলোচনা। অনেকেই প্রশ্ন তুলছেন, সরকারি চাকরিতে মাত্র কয়েক বছরের মধ্যে পিআইও মনসুর রহমানের জীবনযাত্রায় এমন দৃশ্যমান পরিবর্তনের পেছনে প্রকৃত উৎস কী?স্থানীয় সচেতন নাগরিকদের ভাষ্য, সরকারি দায়িত্বে থেকে কেউ যদি হঠাৎ বিপুল সম্পদের মালিক হয়ে ওঠেন, তবে তা স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতার বড় ধরনের সংকেত তৈরি করে। প্রশাসনিক দায়িত্ব পালনের পাশাপাশি এমন সম্পদের উৎস নিয়ে প্রশ্ন উঠলে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)-এর মতো সংস্থার পক্ষ থেকে স্বতঃপ্রণোদিত হয়ে তদন্ত শুরু করা উচিত।পিআইও মনসুর রহমানের বিষয়ে নাগডেমরা ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান মো. হাফিজুর রহমান সময়ের কণ্ঠস্বরকে জানান, মনসুর রহমানের বাবা একজন কৃষক। পিআইওর চাকুরীর সুবাদে তার গ্রামের বাড়িতে একটি চারতলা বিলাসবহুল বিল্ডিং তৈরি করছেন। গত চার বছর যাবৎ বিল্ডিংয়ের কাজ চলছে এখনও শেষ হয়নি। একটি সরকারি চাকুরী করে এত বড় বিলাসবহুল বাড়ি তৈরি করা নিয়ে এলাকার মানুষের মাঝে কৌতুহল রয়েছে।সার্বিক বিষয়ে অভিযুক্ত পিআইও মনসুর রহমানের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি মুঠোফোনে কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি। তিনি জানিয়েছেন, বর্তমানে শারীরিকভাবে অসুস্থ, সুস্থ হলে গাংনী থেকে পাবনা এসে সরাসরি প্রতিবেদকের সঙ্গে দেখা করে কথা বলতে চান। আর্থিক অনিয়মের অভিযোগ ও বিলাসবহুল বাড়ির অভিযোগের বিষয়ে এড়িয়ে গিয়ে তিনি বলেন, ‘আমাকে একটু আপনি সময় দেন। দুই একদিনের মধ্যেই আমি আপনার সঙ্গে দেখা করব।’ সাক্ষাতে কথা বলে এটার অবসান ঘটাতে চান তিনি। জানতে চাইলে গাংনী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) আনোয়ার হোসেন সময়ের কণ্ঠস্বরকে বলেন, প্রকল্পের অর্থ নয়ছয় হচ্ছে এমন কিছু অভিযোগ পেয়ে আমি পিআইওকে বলেছি পুরো কাজ স্টিমেট অনুযায়ী বুঝে নেওয়া হবে। ৩য় কিস্তির টাকা উত্তোলন করে পে-অডার করে রাখার নির্দেশে দিয়েছি এবং পিআইসি সভাপতিদের বলেছি সরকারি টাকা তছরুপাত করা যাবে না। প্রকল্পের কাজ সব বুঝে না পেলে ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।এসকে/আরআই
Source: সময়ের কন্ঠস্বর
