By: Daily Janakantha

টরেন্টোর চিঠি ॥ জীবন তো একটাই বাহে!

উপ-সম্পাদকীয়

11 Jan 2022
11 Jan 2022

Daily Janakantha

বছরের নতুন দিনটি যখন বরফাচ্ছাদিত নায়াগ্রা লেকের ধারে কাটাচ্ছিলাম তখন সন্ধ্যাগুলো সকালের মতো ম্রিয়মাণ, আর সকালগুলো কীসের প্রতীক্ষায় কে জানে! বড়দিনে এবার মোটামুটি পুরো কানাডা টুকটাক তুষার পেয়েছে; এই বিশেষ দিনে তুষারপাত পশ্চিমা বিশ্বের এই প্রান্তের মানুষের কাছে বড্ড আকাক্সক্ষার, প্রত্যাশিত। ছুটির সপ্তাহগুলো এলোমেলো কেটে যায়। তাই তুষারপাত যখন বড়দিনকে ছাড়িয়ে নতুন বর্ষে পদার্পণ করে তখন কেউ অখুশি হয় না। শহর ছাড়িয়ে একটু বাইরে ছুটি কাটাতে গেলে চেষ্টা করি পর্যটকদের পছন্দের কেনাকাটার জায়গা বা রেস্তরাঁগুলো এড়িয়ে যেতে। অমন জায়গায়, করোনার নতুন ভ্যারিয়েন্ট ওমিক্রনের ছোবলে হা-পিত্যেশ করা নতুন বছরের দ্বিতীয় দিনে, শূন্যের নিচে ২০ ডিগ্রী তাপমাত্রায় সন্ধ্যাবেলা হোটেলে ফেরার আগে মন একটু কফি পান করতে চাইবে, এতে অবাক হওয়ার কিছু নেই। কানাডিয়ানরা, হয়ত অনেকেই জানেন, কফি মাত্রই ‘টিম হর্টনস’-এর বোঝেন। আমেরিকানদের প্রিয় কফি যেমন ‘স্টারবাকস’, তেমনি কানাডিয়ানদের ‘টিম হর্টনস’। এর বাইরে টুকটাক ‘সেকেন্ড কাপ’ বা ‘ম্যাকডোনাল্ডস’-এর কফিও চলে, তবে তা তুলনামূলকভাবে বেশ কম। আমি অবশ্য ঘুরতে গেলে সাধারণত ওই এলাকার স্থানীয় কোন কফির দোকান খুঁজে বের করার চেষ্টা করি, তা একটু দূরে হলেও ক্ষতি নেই। শহরের বাইরে যে শহর, রাস্তার পাশে যেখানে বিলবোর্ডের ভিড় নেই, লেকের পানিতে রাজহাঁসেরা ঘুরে বেড়ায় স্বাচ্ছন্দ্যে, ক্ষীণকায় প্রান্তিক রাস্তাগুলোয় বরফ জমে থাকে মাসের পর মাস, মাস্ক খুলে শ্বাস নিলে বুক ভরে যায় ঠাণ্ডা বাতাসে, ফুটপাথের ওপর এলোমেলো টেবিল-চেয়ার ছড়িয়ে থাকে, বিলবোর্ডগুলোতে নিয়ন আলোর বিরল উপস্থিতি– অমন জায়গার কফি আমার আরাধ্য। খুঁজে পেতে, দু’-চারবার ভুল রাস্তা মাড়িয়ে, বরফে ঢাকা রাস্তায় গাড়ির চাকা হড়কিয়ে, নায়াগ্রার মূল শহর পেরিয়ে একদম লেক অন্টারিওর ধারে, যেখানে এখানকার স্থানীয়রা বহুদিন ধরে বাস করছেন, পর্যটকদের বেহেশত হয়ে ওঠেনি এখনও, হবে না হয়ত কোনদিনও, এমনি একটা মফস্বলসদৃশ জায়গায় খুঁজে পেলাম ক্যাটলিনাকে। ক্যাটলিনা কফির দোকানের নাম। বলা যায় মালিকের নামও। কারণ দোকানে ঢুকলে ওভেনের গরম বাতাসের সঙ্গে সঙ্গে একজন উচ্ছল তরুণীর যে প্রাণবন্ত হাসি আপনাকে দমকা হাওয়ার মতো ছুঁয়ে দেবে তিনিই ক্যাটলিনা।
টরেন্টোর মতো ব্যস্ত শহরে যেখানে কায়দামতো ‘অর্ডার’ দিয়ে নিজের নাম বোঝাতে এবং ক্ষণিক পর আবার ওদের মুখে নিজের নাম শুনে, কফি বুঝে নিয়ে দোকান থেকে বের হতে খবর হয়ে যায়, প্রান্তিক শহরে সেই হুজ্জত নেই। আরাম করে অনেকটা সময় নিয়ে দেয়ালে ঝোলানো বোর্ডে চক দিয়ে হাতে লেখা হরেকরকম কফির নাম পড়া গেল সময় নিয়ে। একই সঙ্গে আমাদের আর ক্যাটলিনার মাঝে যে কাচের শোকেস, তাতে নানা তাকে রঙিন ট্রেতে বিছিয়ে রাখা গরম ডোনাটের নামই যে কেবল পড়তে পারছিলাম তা নয়, বরঞ্চ ম ম গন্ধে ভেতরটা উষ্ণ হয়ে যাচ্ছিল। এক পেয়ালা কোরিয়ান কফি আর দুটো কাস্টার্ড কেক পাতে নিয়ে যখন লেকমুখী হয়ে ‘হাই-চেয়ারে’ বসলাম তখন সন্ধ্যা হয়ে গেছে প্রায়। বেশ খানিকটা দূরে নায়াগ্রার উঁচু দালান, ক্যাসিনোর ঝিকমিক বিজ্ঞাপন, ঘুরন্ত চড়কির ছিটেফোঁটা দেখা যাচ্ছিল এতটা দূর থেকেও। কফি আর কেক শেষ করে দেনা-পাওনা বুঝিয়ে দিয়ে ক্যাটলিনার সঙ্গে হাল্কা আলাপ জুড়ে দিই। কফি দোকানের বয়স খুব বেশি হয়নি, যে কারণে হয়ত গুগল ম্যাপে তার হদিস পাইনি। প্রাণবন্ত হাসি দিয়ে ক্যাটলিনা জানাল এখানেই বসবাস তার। এখানেই বাড়ি। এখানেই তাই ব্যবসা গুছিয়ে নেয়ার চেষ্টা। বছরের অল্প কিছুদিন আমাদের মতো পর্যটকদের আনাগোনা থাকলেও বেশিরভাগ সময় স্থানীয়দের ওপর নির্ভর করেই ব্যবসা চলে। বলল গ্রীষ্মকালে একবার ঘুরে যেতে। তখন নাকি রেস্তরাঁ থেকে বেরিয়ে লেকের ধারে বসলে লিলুয়া বাতাসে মন হু হু করে ওঠে অকারণে! ক্যাটলিনার বানানো এক মগ ধোঁয়া ওঠা কফি সেই মন কেমন করা উদাসী বিকেলকে নিজের অজান্তেই সন্ধ্যা বানিয়ে দেয়। দেখা হবে আবার, করোনাকালে সবাই সুস্থ থাক– এই ইদানীংকার চিরচেনা শুভেচ্ছা বার্তা বিনিময় করে সে সন্ধ্যার মতো বিদায় নিলাম ওর কাছ থেকে।
ছুটি থেকে বাস্তবে ফিরতে খুব একটা সময় লাগে না। অন্টারিওতে করোনার প্রাদুর্ভাব তুঙ্গে। হাসপাতালে রিসার্চ স্টাফদের করোনার প্রাদুর্ভাবে সাহায্য করার অনুরোধ জানিয়ে চিঠি এসেছে ইতোমধ্যে। কর্মরত ডাক্তার, নার্স ও অন্যান্য স্বাস্থ্যকর্মী কুলিয়ে উঠতে পারছে না, লাগবে জনস্বাস্থ্যকর্মীদের সাহায্যও। বলা হচ্ছে এই অনুরোধ যে কোন সময় নির্দেশে পরিণত হতে পারে। ৯ জানুয়ারি ২০২২ অন্টারিওতে ১০ হাজার নতুন রোগী করোনায় আক্রান্ত হয়েছেন। যদিও এই সংখ্যা সপ্তাহখানেক আগের চাইতে ঢের কম (১৮ হাজার হয়েছিল তখন), তবুও শঙ্কার বিষয় বটে। হাসপাতালে করোনাক্রান্ত রোগী ভর্তির হার ক্রমশ বেড়ে চলেছে। প্রায় আড়াই হাজার আক্রান্তকে ভর্তি করা হয়েছে হাসপাতালে, যার মধ্যে ৪৩৮ জন আইসিসিইউতে জটিল অবস্থায় আছেন। তার মধ্যে আবার ২৩৪ জনকে ভেন্টিলেশনে রাখতে হচ্ছে। মৃত্যুর হার আরও অনেক বেশি হতো যদি অন্টারিওর প্রায় নব্বই শতাংশ মানুষই দুই ডোজ ভ্যাকসিন না নিতেন। ভ্যাকসিন কাজ করছে। ভ্যাকসিনের কারণে মৃত্যুর হার কমছে, তুলনামূলক কম মানুষ হাসপাতালে ভর্তি হচ্ছে বা জটিলতা কম হচ্ছে। না নিলে আরও বেশি হতো। আরেকটা জিনিস খুব বেশি করে মনে রাখা দরকার। ভ্যাকসিন ডোজের প্রতিরক্ষা ৬ মাস পরেই কমে যাচ্ছে। সুতরাং কেউ যদি দুটো ডোজও নিয়ে থাকেন, কিন্তু শেষ ডোজটির মেয়াদ ছয় মাস পেরিয়ে গিয়ে থাকে তাহলে আপনার আক্রান্ত হবার ঝুঁকি আছে। তাই সুযোগ পেলে আরেক ডোজ ভ্যাকসিন নিয়ে নেয়া জরুরী। ওমিক্রনে যেহেতু শিশুরাও আক্রান্ত হচ্ছে আগের তুলনায় বেশি, সুতরাং শিশু ও গর্ভবতী নারীদের সতর্ক থাকতে হবে। উপযুক্ত প্রার্থীদের ভ্যাকসিন নিতে হবে। সামাজিক ও শারীরিক দূরত্ব বজায় রাখতে হবে। এটি খুব স্বাভাবিক যে, দু’বছর করোনার সঙ্গে লড়াই করে মানুষ ক্লান্ত। আমি বলব আরেকটু লড়াই করুন। তিন-চার ডোজ ভ্যাকসিন, সঙ্গে একবার আক্রান্ত রোগীর প্রাকৃতিক প্রতিরক্ষা বছর শেষে পৃথিবীকে করোনামুক্তির দ্বারপ্রান্তে পৌঁছে দেবে বলে আমার জনস্বাস্থ্যের জ্ঞান বলে। বাকিটা সময়ই বলে দেবে। কিন্তু আর কিছুটা দিন সতর্ক থাকতে হবে, জীবন তো একটাই বাহে!
বড়দিন, করোনা, নববর্ষ আর বছর শেষের দীর্ঘ ছুটি কাটিয়ে কানাডিয়ানরা আবার কাজে ফিরছে। কাজে ফেরা আর ঘরে ফেরা গত দু’বছরে অনেক ক্ষেত্রেই সমার্থক হয়ে গেছে। লিভিং রুম বা বেজমেন্টগুলো অফিস হয়ে উঠেছে অনেকের। এর মাঝেই কানাডার চীনের সঙ্গে কূটনৈতিক বিরোধ নিয়ে আলোচনা চাঙ্গা আছে। প্রায় আশি শতাংশ কানাডিয়ান মনে করেন চীনে শীতকালীন অলিম্পিক বর্জনসহ কানাডার নানামুখী কূটনৈতিক পদক্ষেপ চীনের কূটনৈতিক পদক্ষেপ পরিবর্তনে কোন কাজে আসবে না। বরঞ্চ আতঙ্কিত কানাডার সাম্প্রতিক এসব উদ্যোগে বিশ্বের দ্বিতীয় শক্তিশালী অর্থনীতির দেশটির তেমন কোন ক্ষতিই হবে না। উল্টো প্রভাব পড়তে পারে কানাডার অর্থনীতিতে।
জানুয়ারির শীতটা বেশ জেঁকে বসেছে টরেন্টোয়। রেস্তরাঁগুলোর ভেতরে বসার নিষেধাজ্ঞায় উবার ইটস, ডোরড্যাশের ব্যবসা জেঁকে বসেছে আবার। শীতের সন্ধ্যায় বাংলাপাড়ায় আগের মতো বাঙালীর উপস্থিতি চোখে পড়ে না। ঘরোয়া দাওয়াতও কমে এসেছে ৫ জনের বেশি মানুষের সম্মিলনে সরকারী বাধা থাকায়। এই ফাঁকে ঘরমুখী হয়েছে মানুষ। চারটায় সন্ধ্যা নামে যে শহরে সেখানে হাতের কাছে রাখি মিলন কুণ্ডেরার ‘ইমোরটালিটি’ কিংবা জোসেফ ক্যানোনের ‘দ্য গুড জারমান।’ এমাজন প্রাইমে দেখা হয় ‘আওয়ার ফ্রেন্ড’ এবং ‘দ্য টেন্ডার বয়’-এর মতো ভাল কিছু চলচ্চিত্র, সঙ্গে গরম গরম হট চকোলেট। চুলায় ঘন ডাল আর চিংড়ির মরিচ মাত্র নামানো। বাইরে অন্ধকারে জবুথবু কবুতরের দল। কথার ঝুড়ি নিয়ে আবার দেখা হবে আগামী সপ্তাহে।

১১ জানুয়ারি ২০২২
টরেন্টো, কানাডা

The Daily Janakantha website developed by BIKIRAN.COM

Source: জনকন্ঠ

সম্পর্কিত সংবাদ
ওয়ালটনের পৃষ্ঠপোষকতায় রাখাইন ক্রীড়া উৎসব

ক্রীড়াবান্ধব প্রতিষ্ঠান ওয়ালটন গ্রুপের পৃষ্ঠপোষকতায় ও কক্সবাজারের রাখাইন ক্রীড়া সংস্থার আয়োজনে ফেব্রুয়ারি মাসে শুরু হতে যাচ্ছে ‘ওয়ালটন রাখাইন ক্রীড়া উৎসব-২০২২'। Read more

আট বছরে কয়েক কোটি টাকার মালিক নোমান

আট বছরে কয়েক কোটি টাকার মালিক নোমান প্রথম পাতা 28 Jan 2022 28 Jan 2022 Daily Janakantha নিয়াজ আহমেদ লাবু Read more

কোনোদিকে না তাকিয়ে তুই ১০০ মার, সেঞ্চুরির আগে তামিমকে মাশরাফি

চারশ’রও বেশি দিন পর বাংলাদেশ প্রিমিয়ার লিগের মাধ্যমে ক্রিকেটে ফিরে তাই যেন প্রমাণ দিলেন মিনিস্টার ঢাকার মাশরাফি।

বিএনপি সারা দুনিয়ায় দেশের বিরুদ্ধে অপপ্রচার চালাচ্ছে ॥ তথ্যমন্ত্রী

বিএনপি সারা দুনিয়ায় দেশের বিরুদ্ধে অপপ্রচার চালাচ্ছে ॥ তথ্যমন্ত্রী শেষের পাতা 28 Jan 2022 28 Jan 2022 Daily Janakantha স্টাফ Read more

ভাঙছে পদ্মার পাড়, কাঁদছে মানুষ

কুষ্টিয়ার মিরপুর উপজেলার বহলবাড়ীয়া, সাহেবনগর ও আশপাশের প্রায় ৯ কিলোমিটার এলাকাজুড়ে পদ্মা নদীতে ভাঙন দেখা দিয়েছে। ভাঙনে ইতোমধ্যেই নদী গর্ভে Read more

হুন্ডুরাসে প্রথম

হুন্ডুরাসে প্রথম প্রথম পাতা 28 Jan 2022 28 Jan 2022 Daily Janakantha প্রথম নারী প্রেসিডেন্ট পেল হুন্ডুরাস। বৃহস্পতিবার জিওমারা ক্যাস্ট্রো Read more

আমরা নিরপেক্ষ নই ,    জনতার পক্ষে - অন্যায়ের বিপক্ষে ।    গণমাধ্যমের এ সংগ্রামে -    প্রকাশ্যে বলি ও লিখি ।   

NewsClub.in আমাদের ভারতীয় সহযোগী মাধ্যমটি দেখুন