সড়কে শৃঙ্খলা আর ট্রাফিক নিয়ন্ত্রণে ব্যর্থতার অন্যতম শহর হতে পারে কিশোরগঞ্জ জেলা শহর। সাম্প্রতিক সময়ে কিশোরগঞ্জ জেলা শহরের সার্বিক চিত্র পর্যালোচনা করলে এমনটি মনে হতে পারে যে কারও মনে। আজব এ শহরে দৈনন্দিন কাজে বাসা থেকে বের হতে হয় প্রায় সবাইকে। অথচ যানজটে ঘণ্টার পর ঘণ্টা আটকে থাকার অভিজ্ঞতা হয়নি—এমন কাউকে হয়তো খুঁজে পাওয়া যাবে না।শহর হওয়ায় ব্যস্ততা থাকবে, তাই বলে সড়কে সড়কে অরাজকতা বিষয়টি কেউ মেনে নিতে পারছেন না। এ যানজট কিশোরগঞ্জ শহরের প্রতিদিনকার দৃশ্য। তবে যানজটের পুরনো চিত্র যেন দিনকে দিন আরও প্রকট আকার ধারণ করছে। কিশোরগঞ্জবাসীর জীবন থেকে প্রতিদিন ঘণ্টার পর ঘণ্টা সময় কেড়ে নিচ্ছে এই যানজট। এতে সময় নষ্টের পাশাপাশি বাড়ছে শারীরিক ও মানসিক স্বাস্থ্যঝুঁকি। তবে সড়কের মোড়ে মোড়ে পর্যাপ্ত ট্রাফিক পুলিশ থাকলেও কেন এই যানজট নিরসন করা সম্ভব হচ্ছে না, এমন প্রশ্ন সবার মনে ঘুরপাক খাচ্ছে।শহরবাসীর অভিযোগ, জনদুর্ভোগ কমাতে প্রশাসনের নেই কার্যকর কোনো উদ্যোগ। জেলা প্রশাসন, পৌরসভা আর পুলিশ বিভাগের সমন্বয় না থাকায় খেসারত দিচ্ছে সাধারণ মানুষকে। শহরে চলাচলের জন্য কিশোরগঞ্জ পৌরসভা থেকে ছয় শতাধিক ব্যাটারিচালিত অটোরিকশা অনুমোদন থাকলেও চলাচল করছে প্রায় ৫ থেকে ৬ হাজার ব্যাটারিচালিত অটোরিকশা। প্রতিদিন শহরের প্রবেশ পথ দিয়ে বিভিন্ন উপজেলা থেকে এসব গাড়ি এসে ঢুকে পড়ছে শহরে। এক দিকে সরু রাস্তা, তার ওপর অতিরিক্ত যানবাহনের চাপ। পুরো শহরজুড়ে রাজত্ব ব্যাটারিচালিত অটোরিকশা, মিশুক ও রিকশার। ফুটপাত দখল হয়ে যাওয়ায় হাঁটাও দায় হয়ে পড়েছে। অপ্রশস্ত রাস্তা, অটোরিকশার আধিক্য, অদক্ষ চালক, যেখানে-সেখানে অটোস্ট্যান্ডে যাত্রী ওঠানামা, ফুটপাত দখল, পার্কিংয়ের জায়গার অভাবসহ নানা কারণে যানজট সৃষ্টি হচ্ছে বলে মনে করছেন শহরবাসী।সপ্তাহের অন্যান্য দিনের মতো শনিবার (০২ আগস্ট) সকাল থেকে শহরের গৌরাঙ্গ বাজার, পুরান থানা, একরামপুর, আখড়া বাজার ও আঠারোবাড়ি কাচারিসহ বিভিন্ন মোড়ে গিয়ে দেখা যায়, ঘণ্টার পর ঘণ্টা রাস্তায় থেমে আছে গাড়ির চাকা। মাঝে মাঝে চললেও নেই গতি। ব্যাটারিচালিত রিকশা ও অটোরিকশায় সৃষ্টি হওয়া দীর্ঘ যানজটে গন্তব্যে পৌঁছাতে সময় লাগছে দ্বিগুণ। এতে সময় ও অর্থ যেমন নষ্ট হচ্ছে, মানুষের দুর্ভোগও ছাড়িয়ে যাচ্ছে সহনীয়তার সব সীমা। শহরের বাসিন্দারা প্রতিদিনের যানজটের কবলে পড়ে নানা স্বাস্থ্য সমস্যার মুখোমুখি হচ্ছেন। এতে প্রায় সব পরিবারে বাড়ছে চিকিৎসা ব্যয়। বাড়ছে মানসিক সমস্যাও। এর মধ্যে যানজটে সবচেয়ে বেশি ভোগান্তি নারী-শিশুদের। এদিকে শহরের যানজট নিয়ে জেলা আইনশৃঙ্খলা কমিটির সভায় বারবার আলোচনা হলেও কার্যত মিলছে না কোনো সমাধান।শহরবাসীদের অভিযোগ, ট্রাফিক পুলিশসহ প্রশাসন যদি আগের মতো সড়কে কাজ না করে তবে এই যানজট দিনকে দিন বেড়েই চলবে।ব্যাটারিচালিত অটোরিকশা চালক হবিল মিয়া বলেন, পেটের দায়ে প্রচণ্ড গরমের মধ্যেও রিকশা নিয়ে বের হয়েছি। ‘ঘরে একটু খাবার থাকলে আজ এত যানজটের মধ্যে রিকশা চালাতে আসতাম না। যানজটের কারণে আগের চেয়ে আয় অনেক কমে গেছে। গরম হোক আর ঝড় হোক, পেট তো আর এসব মানবে না।’সদর উপজেলা যশোদল থেকে জেলা শহরে প্রাইভেট পড়তে আসা পৌর মহিলা কলেজের শিক্ষার্থী রুনা আক্তার বলেন, গত দু’বছর ধরে সপ্তাহে চার দিন এ শহরে প্রাইভেট পড়তে আসতে হয়। প্রতিদিনই কমবেশি যানজটে পড়ে সময় অপচয় হচ্ছে। মনে হচ্ছে, এ শহরের যানজট তার প্রতিদিনের সঙ্গী। যানজটে পড়ে সময় অপচয়ের কারণে লেখাপড়ার ক্ষতি হচ্ছে।শোলাকিয়া থেকে শ্বাসকষ্টের রোগী নিয়ে জেলা সদর হাসপাতালে আসা রবিউল হুসাইন বলেন, শোলাকিয়া থেকে অটোতে করে হাসপাতালে যেতে সময় লাগবে সর্বোচ্চ ১৫ মিনিট। সেখানে যানজটের কারণে সময় লেগেছে প্রায় ৫৪ মিনিট। এমনিতেই শ্বাসকষ্টের রোগী, তারপর যানজট। সময়মতো হাসপাতালে যেতে না পারায় দুর্ঘটনাও ঘটতে পারতো। এর থেকে পরিত্রাণ চান তারা।বেসরকারি একটি প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তা আল আমিন হোসেন বলেন, সড়কে দিনকে দিন যানজট বেড়েই চলছে। আগের চেয়ে বেড়েছে এই যানজট। পর্যাপ্ত ট্রাফিক পুলিশ সড়কে যেন থেকেও নেই। তারা আগের মতো ট্রাফিক নিয়ন্ত্রণে কাজ করছে না। আগে যেভাবে তারা সড়কে দায়িত্ব পালন করতেন, এখন অনেকটা তারা নীরব দর্শকের মতো দায়িত্ব পালন করছেন।জেলা শহরের নীলগঞ্জ এলাকার বাসিন্দা কামরুল ইসলাম বলেন, যানজট অন্য যেকোনো সময়ের চেয়ে অনেক বেড়েছে। আসলে পুলিশের আগে উপরি আয় ছিল, এখন তো তা বন্ধ, তাই তারা আগের মতো কাজ করে না। পুলিশ এখন ঘুষও নেয় না, কাজও করে না। তারা যদি ঠিক মতো কাজ করে তবে এই যানজট দূর করা কঠিন কিছু না। পুলিশের ঠিক মতো কাজ না করাই এই যানজটের মূল কারণ।একাধিক ট্রাফিক পুলিশ সদস্যের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, সরকার পরিবর্তনের পর অনেক কিছুই পরিবর্তিত হয়েছে। বর্তমান পরিস্থিতিতে সড়কে দাঁড়িয়ে দায়িত্ব পালন করতে আগের মতো স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করেন না পুলিশ সদস্যরা। মানুষ তাদের কথা শোনেন না, সড়কে কেউ সিগন্যাল মানতে চান না। যেখানে-সেখানে গাড়ি দাঁড় করিয়ে রাখেন। অনিয়মের বিরুদ্ধে আইনি পদক্ষেপ নিতে গেলে তেড়ে আসেন চালক ও যাত্রীরা।পুরান থানা এলাকায় দায়িত্ব পালনের অভিজ্ঞতার কথা জানিয়ে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক ট্রাফিক সার্জেন্ট বলেন, ব্যাটারিচালিত অবৈধ রিকশা আসছিল, আমি রিকশা আটকে বলি, পৌর সড়কে ব্যাটারিচালিত রিকশা চালাচ্ছেন, এখন আপনার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে। এটি শুনে যাত্রী ও চালক দুজনেই আমার ওপর ক্ষিপ্ত হয়ে ওঠেন। উল্টো আমার সঙ্গে খারাপ আচরণ করেন।জেলা ট্রাফিক পুলিশের টিআই (প্রশাসন) সৈয়দ মনিরুজ্জামান সময়ের কণ্ঠস্বরকে জানান, কিশোরগঞ্জ সরু গলির শহর। এর মধ্যে রাস্তার দুই পাশে ফুটপাতে হকার বসে। রাখা হয় মোটরসাইকেল। অতিরিক্ত অটোরিকশা চলাচল করে। তবু আমরা চেষ্টা করছি যানজট নিয়ন্ত্রণে রাখার।প্রতিবারের মতো আশ্বাস দিয়ে কিশোরগঞ্জ পৌরসভার প্রশাসক সৈয়দ শফিকুর রহমান সময়ের কণ্ঠস্বরকে বলেন, সকলের সমন্বিত উদ্যোগ ছাড়া সমাধান সম্ভব নয়। সকলের সাথে পরামর্শ করে একটি গ্রহণযোগ্য পদ্ধতি অবলম্বন করে দ্রুতই পদক্ষেপ নেয়া হবে।এআই
Source: সময়ের কন্ঠস্বর
