আধুনিক সভ্যতার প্রধান চালিকাশক্তিই বিদ্যুৎ। এটি আমাদের জীবনের নিত্য দিনের সহচর। তবে বর্তমানে রাজধানী ঢাকাসহ গোটা বাংলাদেশে বিদ্যুৎ সংকটে সৃষ্ট লোডশেডিংয়ের যাঁতাকলে পড়ে বিষিয়ে উঠেছে জনজীবন।বিদ্যুৎ ঘাটতি পূরণের বিকল্প হিসেবে সরকারের পক্ষ থেকে সারাদেশে এলাকাভিত্তিক এক ঘণ্টা করে লোডশেডিংয়ের ঘোষণা দিলেও ঘণ্টার পর ঘণ্টা লোডশেডিংয়ের অভিযোগ পাওয়া যাচ্ছে।বিদ্যুৎ সংকটে লোডশেডিং দেশে নতুন কোনো বিষয় নয়। বিদ্যুতের স্বাভাবিক উৎপাদন ব্যহত হওয়ার সাথে সাথে এর যথাযথ ব্যবহার নিশ্চিত না হওয়ার ফলে দেশের সার্বিক উন্নয়ন মারাত্মকভাবে পিছিয়ে যাচ্ছে। ফলে দেশে বিদ্যমান বিদ্যুৎ সমস্যা নিরসন করে সার্বিক বাধা মোকাবেলা করে দেশের উন্নয়নের ধারা অব্যাহত রাখা সময়ের দাবি হয়ে পড়েছে।এনামুল হক ইমন নামে মিরপুরের একজন বাসিন্দা জানান, ‘লোডশেডিং আমাদের দৈনন্দিন জীবনে চরম সমস্যার সৃষ্টি করছে। বিশেষ করে রাতে বিদ্যুৎ চলে গেলে বিস্তীর্ণ এলাকাজুড়ে নেমে আসে অন্ধকার। এতে করে চুরি, ছিনতাই, ডাকাতি বৃদ্ধি পাচ্ছে। ছেলেমেয়েদের লেখাপড়ার সময়টিতে কম করে হলেও ২ থেকে ৩ বার এবং প্রতিবার কমপক্ষে এক ঘণ্টা করে লোডশেডিং চলে। লোডশেডিংয়ের বিকল্প হিসেবে আলোর ব্যবস্থা করা হলেও প্রচণ্ড গরমে ছাত্র-ছাত্রীদের পড়াশোনায় বিঘ্ন ঘটছে। বিদ্যুৎ সংকট দেশের শিক্ষার্থীদের ক্ষতি করছে সবচেয়ে বেশি।’রাজধানীর মিরপুরের নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একজন গার্মেন্টস ব্যবসায়ী বলেন, ‘বিদ্যুৎ সংকটে ঘন ঘন লোডশেডিংয়ের ফলে প্রচণ্ড রকমে অতিষ্ঠ হয়ে আমার প্রতিষ্ঠানের শ্রমিক, কর্মচারী-কর্মকর্তাগণ স্বাভাবিক কর্মকাণ্ড চালাতে পারছেন না। এতে করে আমার শিল্প কারখানাটির উৎপাদন চরমভাবে বিঘ্নিত হচ্ছে। শুধুমাত্র আমার গার্মেন্টসই নয়, দেখা গেলো আমার কারখানার মতো রাজধানীর বিভিন্ন কারখানায় পুরোদমে কাজ চলছে, হঠাৎ হঠাৎ করেই চলে গেলো বিদ্যুৎ। অবশ্যই বাধ্যতামূলক সমস্ত উৎপাদন মুখ থুবড়ে পড়ে। এতে আমাদের গার্মেন্টস কারখানা মালিকদের কী পরিমাণ ক্ষতি হয় সেটি আমরাই বুঝি।’রাজধানীর একটি প্রাইভেট হাসপাতালে তার অসুস্থ শিশুর চিকিৎসা নিতে এসেছেন জেসমিন আক্তার নামে এক নারী। বিদ্যুৎ চলে যাওয়ায় প্রচণ্ড গরমে অতিষ্ঠ হয়ে অসুস্থ শিশুকে নিয়ে হাসপাতাল থেকে খোলা আকাশের নিচে নেমে এসেছেন বাধ্য হয়ে। তিনি আক্ষেপ করে বলেন, ‘বিদ্যুৎ সংকট চিকিৎসা ক্ষেত্রের জন্যে অত্যন্ত বিপদজনক, এমনকি অনেক সময় জীবনহানিকর হতে পারে। দেখা গেলো, ডাক্তার রোগীর গুরুত্বপূর্ণ কোনো অপারেশন করছেন। এমন সময় চলে গেলো বিদ্যুৎ। এক্ষেত্রে রোগীর জীবনমৃত্যুর আশঙ্কা স্বাভাবিক। ফলে হাসপাতালে সবসময় বিদ্যুতের বিকল্প হিসেবে জেনারেটর কিংবা অন্যান্য ব্যবস্থা থাকা উচিত।’এদিকে সরকারি তথ্য অনুযায়ী, দেশে বিদ্যুতের চাহিদার বিপরীতে ২০২১ সালে বিদ্যুৎ উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছিলো ২৪ হাজার মেগাওয়াট। পক্ষান্তরে সেটি বৃদ্ধি পেয়ে বর্তমানে দেশের মোট ২৫ হাজার ৭০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন ক্ষমতা রয়েছে। চলতি বছরের এপ্রিল মাস পর্যন্ত মোট ১৪ হাজার ৭৮৫ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদিত হয়েছে দেশে। এর বিপরীতে সারাদেশে ৬ লক্ষ ২৯ হাজার কিলোমিটার জুড়ে সংযোগ লাইনে মোট ৪ কোটি ৩২ লাখ গ্রাহক রয়েছে। এর মধ্যে ৪৯ হাজার ৫০০ প্রিপেইড মিটার ও ৬০ হাজার সোলার হোম সিস্টেমে আনা হয়েছে। এমনকি ২০৩০ সাল নাগাদ ৩৯ হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা স্থির করেছে সরকার।বিশেষজ্ঞ মহল দাবি করছেন, দেশে দিন দিন বিদ্যুতের চাহিদা বাড়ছেই। সেক্ষেত্রে আমলাতান্ত্রিক কারণে দেশে বেশ কয়েকটি বিদ্যুৎ প্লান্ট সঠিক রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে দীর্ঘদিন যাবৎ অকেজো হয়ে পড়ে আছে বিধায় বিদ্যুৎ উৎপাদন ব্যহত হচ্ছে। যেগুলো সচল রয়েছে সেগুলোও দীর্ঘমেয়াদী কার্যক্ষমতা ও উপযুক্ত পর্যবেক্ষণের অভাব, কাঁচামালের সরবরাহের অভাবে চাহিদানুযায়ী বিদ্যুৎ উৎপাদনে ব্যর্থ হচ্ছে।এছাড়া নতুন উৎপাদন কেন্দ্র স্থাপনের জন্য উন্নত প্রযুক্তি ও যন্ত্রপাতির অভাব। একদিকে সরকারের পরনির্ভরশীল মনোভাব, অন্যদিকে অবৈধ সংযোগ, সিস্টেম লস, স্বচ্ছতার অভাব, বর্তমান রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতা ও প্রশাসনিক জটিলতায় বিদ্যুৎ সংকট সৃষ্টি ও লোডশেডিংয়ের যাঁতাকলে পড়েছে দেশবাসী।আরডি
Source: সময়ের কন্ঠস্বর
