দুপুর ১টার একটু পর। রাজধানীর উত্তরা তখনো স্বাভাবিক ছন্দে চলছিল। কিন্তু হঠাৎ দিয়াবাড়ি এলাকায় বিকট শব্দে কেঁপে উঠল চারপাশ। মাইলস্টোন স্কুল অ্যান্ড কলেজের ‘হায়দার আলী’ ভবনের ওপর আছড়ে পড়ল বাংলাদেশ বিমানবাহিনীর একটি যুদ্ধবিমান। মুহূর্তেই পুরো ভবনটিতে ছড়িয়ে পড়ে আগুন, ধোঁয়া আর মৃত্যু। কক্ষের ভেতর ছোট ছোট কোমলমতি শিক্ষার্থীরা তখন প্রাণভয়ে ছুটোছুটি করছে।সেই ভয়ংকর মুহূর্তে অনেকেই হয়তো জীবন বাঁচাতে দৌড়েছিলেন। কিন্তু একজন শিক্ষিকা ছিলেন, যিনি পালাননি—থেমে গিয়েছিলেন অন্যদের জীবন বাঁচাতে। তিনি মাহেরীন চৌধুরী, স্কুলটির একটি শাখার কো-অর্ডিনেটর। আগুনের লেলিহান শিখার মাঝখানে দাঁড়িয়ে তিনি চেষ্টা করছিলেন তার শিক্ষার্থীদের বের করে আনতে। নিজের জীবন দিয়ে যেন অনেক মায়ের কোল রক্ষা করে গেলেন তিনি।আগুনের ভেতরেও সহানুভূতির আলো:প্রত্যক্ষদর্শীরা জানিয়েছেন, মাহেরীন চাইলে আগেই বেরিয়ে যেতে পারতেন। কিন্তু তিনি তা করেননি। শিক্ষার্থীদের বের করার চেষ্টায় সময়ক্ষেপণ হয় তার। সেই সময়েই ধোঁয়া ও আগুনে আক্রান্ত হন তিনি।তার ভাই মুনাফ মুজিব চৌধুরী বলছিলেন, ‘উনার মানসিক জোর ছিল অদ্ভুত রকমের। বার্ন ইউনিটে পৌঁছেও আমরা তাকে জীবিত পেয়েছিলাম। কথা বলছিলেন। কিন্তু অবস্থাটা খুবই খারাপ ছিল। পরে চিকিৎসকেরা জানান, তার শ্বাসনালি পুরোপুরি পুড়ে গিয়েছে।’চিকিৎসকরা জানান, মাহেরীনের শরীরের প্রায় ১০০ শতাংশই দগ্ধ হয়েছিল। তাকে লাইফ সাপোর্টে নেওয়া হয়, কিন্তু সোমবার রাত ৯টার কিছু আগে তিনি মৃত্যুবরণ করেন।লাইফ সাপোর্টে নেওয়ার আগমুহূর্তে স্বামী মনসুর হেলালের সঙ্গে কিছু সময়ের জন্য কথা হয় তার। তিনি বলেন, ‘স্কুল ছুটির পর বাচ্চাদের নিয়ে বের হচ্ছিলেন মাহেরীন। সেই সময়েই গেটের সামনেই বিমানটা বিধ্বস্ত হয়। তখনও সে চেষ্টা করেছে বাচ্চাদের বাঁচাতে। নিজে দগ্ধ হয়েও।’মাহেরীনের সংসারে রয়েছে দুটি সন্তান—একজন নবম শ্রেণিতে পড়ছে, বয়স ১৪; অন্যজন ও লেভেলের শিক্ষার্থী, বয়স ১৫ বা ১৬। স্কুলগামী সেই দুই শিশুর জীবন থেকে মাত্র এক ঝলকেই হারিয়ে গেল তাদের সবচেয়ে বড় আশ্রয়—তাদের মা।মঙ্গলবার ভোরে মাহেরীনের প্রথম জানাজা হয় উত্তরার গাউছুল আজম জামে মসজিদে। পরে নীলফামারীর জলঢাকার বগুলাগাড়িতে তার দাফন সম্পন্ন হয়।এফএস
Source: সময়ের কন্ঠস্বর
