রাজনৈতিক পরিচয়ের আড়ালে দখলদারিত্ব, চাঁদাবাজি ও ভীতি প্রদর্শনের মাধ্যমে ত্রাসের রাজত্ব কায়েম করেছিলেন তিনি। এমনকি সেনাবাহিনীর কাছে বিচার চাওয়ায় প্রতিশোধ নিতে গিয়ে প্রকাশ্য বাজারে গুলি ছুড়তেও দ্বিধা করেননি। অবশেষে সেই বেপরোয়া কর্মকাণ্ডের জেরে কক্সবাজারের রামু উপজেলার দক্ষিণ মিঠাছড়ি ইউনিয়ন যুবদলের আহ্বায়ক আব্দুল্লাহ ভুট্টোকে শোকজ করেছে দলটি।রামু উপজেলা যুবদলের আহ্বায়ক জহির আলম ও সদস্য সচিব তৌহিদুল ইসলাম স্বাক্ষরিত এক প্রেস বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়, ভুট্টোর বিরুদ্ধে সংগঠনের শৃঙ্খলা ও নির্দেশনার লঙ্ঘনের অভিযোগ পাওয়া গেছে, যা নেতৃত্বের প্রতি চরম অবজ্ঞা ও ধৃষ্টতা প্রদর্শনের শামিল। সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত প্রতিবেদন এবং ভুক্তভোগীদের অভিব্যক্তির ভিত্তিতে তদন্ত শুরু হয়েছে। তাকে তিন দিনের মধ্যে স্বশরীরে উপস্থিত হয়ে আহ্বায়ক কমিটির কাছে লিখিত ব্যাখ্যা দিতে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।ঘটনার সূত্রপাত গত শুক্রবার রাত সাড়ে ৮টার দিকে। দক্ষিণ মিঠাছড়ি স্টেশনে প্রতিপক্ষকে লক্ষ্য করে প্রকাশ্যে দুই রাউন্ড গুলি ছোড়ে ভুট্টো ও তার সহযোগীরা। গুলিতে কেউ হতাহত না হলেও মুহূর্তেই বাজারজুড়ে থমথমে অবস্থা তৈরি হয়। এরপর থেকে ভুক্তভোগীরা নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছেন বলে জানান।ভুক্তভোগী আহমদ উল্লাহ রামু থানায় লিখিত অভিযোগ দিয়ে জানান, গত ইউপি নির্বাচনে তিনি পরাজিত প্রার্থী দুদু মিয়ার পক্ষে প্রচার চালিয়েছিলেন। ওই নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতাকারী ভুট্টো হেরে যাওয়ার পর থেকে তার ওপর ক্ষুব্ধ হয়ে ওঠেন। কিছুদিন আগে এক লাখ টাকা চাঁদা দাবি করেন, না দিলে পুলিশ দিয়ে হয়রানির হুমকি দেন।পরিস্থিতি আরও উত্তপ্ত হয় শুক্রবার সন্ধ্যায়। আহমদের ভাই সালামত উল্লাহ বাজারে গেলে ভুট্টো তাকে অস্ত্র উঁচিয়ে ধাওয়া করেন। সালামত দৌড়ে বাড়িতে ঢুকলে পরিবারের সদস্যরা ছুটে এলে তাদের লক্ষ্য করেই গুলি ছোড়েন ভুট্টো। স্থানীয় ব্যবসায়ী ও প্রত্যক্ষদর্শীরা ঘটনার সত্যতা নিশ্চিত করেন।স্থানীয়দের অভিযোগ, ৫ আগস্টের পর থেকেই ভুট্টো একচ্ছত্র আধিপত্য কায়েম করেছেন। রাজনৈতিক মামলায় ফাঁসিয়ে দেওয়ার ভয় দেখিয়ে এলাকার ব্যবসায়ী, বিত্তশালী ব্যক্তিদের কাছ থেকেও নিয়মিত মাসোয়ারা আদায় করছেন। যারা দিতে অস্বীকৃতি জানায়, তাদের রাজনৈতিক কিংবা ‘হত্যা মামলায় ঢুকিয়ে দেওয়ার’ হুমকি দেওয়া হয়।এক গাছ ব্যবসায়ী শফি আলম বলেন, ভুট্টো নিজেকে ক্ষমতাসীন দলের সঙ্গে সম্পৃক্ত দাবি করে এক লাখ টাকা দাবি করেন। না দিলে আ. লীগ নেতা বানিয়ে খুনসহ রাজনৈতিক মামলায় জড়িয়ে দেওয়ার ভয় দেখান। বাধ্য হয়ে টাকা দিয়েছি, পরিবার নিয়ে থাকি, প্রতিবাদ করতে পারি না বলে জানান তিনি।স্থানীয়রা বলছেন, ভুট্টো রাজনৈতিক মামলা দিয়ে ভয় দেখিয়ে ব্যবসায়ী ও বিত্তবানদের মাসোহারা দিতে বাধ্য করছেন। যে কাউকে রাজনৈতিক মামলার ভয় দেখিয়ে দেন চাঁদার চাপ। কেউ রাজি না হলে হুমকি দেন হত্যা মামলায় ঢুকিয়ে দেওয়ার।স্থানীয় আরেকজন জানান, আমি রাজনীতির সঙ্গে জড়িত নই, তাও দুইবার টাকা নিয়েছে। বলেছে, কথা না শুনলে মামলায় ঢুকিয়ে দেবে।স্থানীয়দের ভাষ্য অনুযায়ী, রাজনৈতিক পরিচয়ের সুযোগে ভুট্টো পুরো দক্ষিণ মিঠাছড়িকে নিজের ‘নিয়ন্ত্রণশালা’ বানিয়ে ফেলেছেন। চাঁদাবাজি, বালু উত্তোলন, মাদক ব্যবসা ও অস্ত্রের মহড়ায় দাপট দেখিয়ে চলেছেন তিনি। ভয়ের রাজত্ব বজায় রাখতে বিভিন্ন এলাকায় সিসিটিভি ক্যামেরা বসিয়েছেন, যাতে এলাকাবাসীর গতিবিধি নিয়ন্ত্রণে থাকে। ব্যবহারে রয়েছে ওয়াকি-টকি সেট, যা সাধারণত আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সঙ্গে সংযুক্তদের হাতে দেখা যায়।এলাকাবাসীর দাবি, আব্দুল্লাহ ভুট্টোর বেপরোয়া কর্মকাণ্ড শুধু চাঁদাবাজি বা হুমকির মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক পরিমণ্ডলেও তার আগ্রাসী হস্তক্ষেপ বাড়ছে।একাধিক ধর্মপ্রাণ প্রবীণ বাসিন্দা বলেন, ভুট্টো তিন শত বছরের পুরনো একটি ধর্মীয় স্পৃতি ও ঐতিহ্যবাহী মাঠ দখল করে সেখানে বলিখেলার নামে জোয়ার আসর বসিয়েছিল। এ নিয়ে এলাকায় ব্যাপক ক্ষোভ ছড়িয়ে পড়ে।স্থানীয় যুবদল নেতাকর্মীরা অভিযোগ করেন, ভুট্টো নিজেকে সাবেক এক সংসদ সদস্য এবং কেন্দ্রীয় যুবদল নেতার পিএস-এর ঘনিষ্ঠ বলে দাবি করেন। সেই ‘মোসোয়ারার’ জোরেই তিনি এলাকায় চাঁদাবাজি, জমি দখল, এমনকি ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত হানা কাজেও দ্বিধাবোধ করেন না। এতে রাজনৈতিক আশ্রয়-প্রশ্রয়ের আড়ালে ভুট্টোর অপকর্মের বলয় আরও বিস্তৃত হচ্ছে বলে দাবি করেন তারা।স্থানীয় বলছেন, ভুট্টো এখন আর রাজনৈতিক নেতা নয়, সে এই অঞ্চলের গডফাদার।রাজনৈতিক বিশ্লেষকের ভাষায়, যে এলাকায় চাঁদা না দিলেই গুলি চলে, সেখানে রাষ্ট্রের অস্তিত্বই প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে পড়ে। রাজনৈতিক পরিচয়ে এভাবে অপরাধীদের রক্ষা মানেই সন্ত্রাসকে বৈধতা দেওয়া।অভিযোগ অস্বীকার করেছেন আব্দুল্লাহ ভুট্টো। তিনি এসব অভিযোগকে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত ও ভিত্তিহীন বলে দাবি করে বলেন, আমাকে হেয় করার ষড়যন্ত্র চলছে।রামু উপজেলা যুবদলের আহ্বায়ক জহির আলম বলেন, ভুট্টোর বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগের অধিকাংশই সত্য প্রমাণিত হয়েছে। তাকে ব্যাখ্যা দিতে বলা হলেও এখনো উপস্থিত হননি। দলের হাইকমান্ডের নির্দেশনা অনুযায়ী, কেউ দলীয় নাম ভাঙিয়ে অপরাধে জড়ালে তাকে তাৎক্ষণিকভাবে বহিষ্কার করা হবে।তিনি আরও জানান, গত কয়েকদিনে আমরা কয়েকজন বিতর্কিত নেতাকে বহিষ্কার করেছি, এসব ঘটনায় আমরা সাংগঠনিকভাবে বিব্রত। ভুট্টোর বিষয়েও সিনিয়রদের সঙ্গে আলোচনা হয়েছে। দ্রুতই তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।বিএনপির জাতীয় নির্বাহী কমিটির মৎস্যজীবী বিষয়ক সম্পাদক ও সাবেক সংসদ সদস্য লুৎফুর রহমান কাজল বলেন, দল কাউকে গুলাগুলি করার অধিকার দেয়নি। যদি অভিযোগের সত্যতা মেলে, তার বিরুদ্ধে কঠোর সাংগঠনিক ব্যবস্থা নেওয়া হবে। ব্যক্তির দায় দল নেবে না।এসআর
Source: সময়ের কন্ঠস্বর
