কক্সবাজারের টেকনাফ ও উখিয়া। এই দুই উপকূলীয় উপজেলায় ছড়িয়ে পড়েছে এক অজানা ভাইরাস। জ্বর, সারা শরীর ও গিরা ব্যথা, পা ফুলে যাওয়া, মাথা ঘোরা, চুলকানি- এসব উপসর্গ নিয়ে বাড়ি বাড়ি ছড়িয়ে পড়েছে রোগটি। প্রথমে রোহিঙ্গা ক্যাম্পে শনাক্ত হলেও এখন এটি আশপাশের গ্রাম ও পুরো কক্সবাজার জেলায় বিস্তার লাভ করেছে।উপজেলা স্বাস্থ্য বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, প্রায় দেড় মাস ধরে চলমান এই অজানা ভাইরাসের প্রকোপে প্রতিদিনই হাসপাতালে ভিড় করছেন রোগীরা। অনেকে আবার বিছানায় পড়ে আছেন দিনের পর দিন।টেকনাফের নোয়াপাড়া গ্রামের বাসিন্দা ছৈয়দুল আমিন চৌধুরী বলেন, ‘প্রথমে ছোট মেয়ে আক্রান্ত হয়। এরপর একে একে পরিবারের ৬-৭ জন। শরীরে প্রচণ্ড জ্বর, সমস্ত গিরায় ব্যথা, এমনকি হাঁটতে পারতাম না। মুখে খাবারের রুচি ছিল না। ডাক্তার শুধু ব্যথার ওষুধ আর পানি-পানীয় খাওয়ার পরামর্শ দেন।’একই এলাকার আরেক বাসিন্দা গৃহবধূ রাবেয়া খাতুন বলেন, ‘আমার পা এমন ফুলে গিয়েছিল যে নিজের পায়ে দাঁড়াতেও পারিনি। ডায়বেটিস থাকায় এখন পর্যন্ত পুরোপুরি সেরে উঠিনি। ভয় হচ্ছে আবার যেন না হয়।’টেকনাফ উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের মেডিকেল অফিসার ডা. প্রণয় রৌদ্র বলেন, ‘এই রোগটি ডেঙ্গু বা চিকুনগুনিয়ার মতো হলেও টেস্টে সেগুলোর অস্তিত্ব পাওয়া যাচ্ছে না। প্লাটিলেট অনেক সময় কমে যাচ্ছে। অনেক রোগীর শরীরে ব্যথা এত বেশি থাকে যে চলাচল করতেও অন্যের সাহায্য লাগে। আমরা রোগীদের আতঙ্কিত না হয়ে চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী চলার অনুরোধ করছি।’তিনি আরও বলেন, ‘এ রোগে অ্যান্টিবায়োটিক সেবন বিপজ্জনক হতে পারে। বরং বিশ্রাম, প্রচুর তরল গ্রহণ এবং ব্যথানাশক ওষুধ যথাযথভাবে নেওয়াই উত্তম।’স্থানীয়দের দাবি, রোগটির শুরু রোহিঙ্গা ক্যাম্প থেকেই। সেখানকার ঘনবসতি, অপরিচ্ছন্ন পরিবেশ এবং অনিয়ন্ত্রিত স্বাস্থ্যসেবা ব্যবস্থার কারণে এটি দ্রুত ছড়িয়ে পড়ছে।টেকনাফ পৌরসভার বাসিন্দা ও স্থানীয় সাংবাদিক আবদুর রহমান বলেন, ‘নরোহিঙ্গা ক্যাম্পের কয়েকজনের কাছেই প্রথম শুনি এমন জ্বর হচ্ছে। পরে আমার পরিবারের সদস্যসহ আমি আক্রান্ত হই। জীবনে এত ভয়ানক শরীর ব্যথা কখনও হয়নি। মনে হচ্ছিল, শরীরটাই যেন ভেঙে পড়ছে।’রোগীরা বলছেন, কেউ কেউ সেরে উঠেও আবার আক্রান্ত হচ্ছেন। এতে আতঙ্ক আরও বেড়েছে। বিশেষ করে যাদের ডায়বেটিস ও অন্য অসুস্থতা রয়েছে, তাদের মধ্যে রোগের স্থায়িত্ব বেশি দেখা যাচ্ছে।টেকনাফের সাবরাং এলাকার বাসিন্দা মো. সেলিম বলেন, ‘আমি প্রথমবার আক্রান্ত হওয়ার ১২ দিন পর সুস্থ হই। কিন্তু ২০ দিন পর আবার আগের মত উপসর্গ দেখা দেয়। ডাক্তাররা কিছুই ধরতে পারছে না।’হোয়াইক্যংয়ের মুদি দোকানদার মোহাম্মদ ইউনুছ বলেন, ‘এই রোগে পড়লে মনে হয় শরীরের হাড়গুলো গুঁড়িয়ে যাচ্ছে। আমি এক সপ্তাহ দোকান খুলতে পারিনি। এমনকি টয়লেটেও যেতে হতো পরিবারের কারও সহায়তা নিয়ে।’উখিয়ার ইনানীর গৃহবধূ সাজেদা বেগম বলেন, ‘আমার দুই সন্তানসহ আমি আর স্বামী- চারজনই আক্রান্ত হয়েছি। সবার জ্বর একসঙ্গে উঠেছে। রাতে ঘুমানো যায় না। সারা শরীরে চুলকানি আর ব্যথা। ওষুধ খেয়ে তেমন কাজ হয়নি। শুধু পানি, ডাব আর ফল খেয়ে কোনোমতে বেঁচে আছি।’টেকনাফের হ্নীলা ইউনিয়নের এক সদস্য বলেন, ‘প্রতিদিনই কোনো না কোনো বাড়ি থেকে আক্রান্ত রোগীর খবর আসছে। আগে শুধু রোহিঙ্গা ক্যাম্পে সীমাবদ্ধ ছিল, এখন হ্নীলা, হোয়াইক্যং, সাবরাং, নয়াপাড়া; সব এলাকায় ছড়িয়ে পড়েছে। এটা রীতিমতো উদ্বেগজনক। স্বাস্থ্য বিভাগকে আরও সক্রিয় হওয়া দরকার।’রোহিঙ্গা ক্যাম্পে কাজ করা এনজিও স্বাস্থ্যকর্মী হাসিনা আক্তার বলেন, ‘ক্যাম্পে এমন ভাইরাল জ্বরের রোগী প্রতিদিনই পাওয়া যাচ্ছে। কিন্তু ডেঙ্গু বা চিকুনগুনিয়ার রিপোর্ট নেই। এই রোগ নিয়ে রোগীরা খুব হতাশ, কারণ বারবার আক্রান্ত হচ্ছে।’কক্সবাজার সিভিল সার্জন অফিসের একজন কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, ‘স্থানীয় হাসপাতাল থেকে কিছু তথ্য আমরা পেয়েছি। তবে নির্দিষ্ট কোনো ভাইরাস শনাক্ত হয়নি এখনো। এটা কোনো নতুন ভাইরাস ইনফেকশন কি না, সেটি জানার জন্য রোগীদের রক্তের নমুনা সংগ্রহ করে পরীক্ষার জন্য ঢাকায় পাঠানো হবে।’জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এই মুহূর্তে সবচেয়ে জরুরি হলো সচেতনতা। আক্রান্ত ব্যক্তিকে বিশ্রামে রাখা, প্রচুর পানি পান, পরিচ্ছন্নতা বজায় রাখা এবং ডাক্তারের পরামর্শ ছাড়া ওষুধ না খাওয়া- এই পদক্ষেপগুলো অনুসরণ করলেই দ্রুত সুস্থ হওয়া সম্ভব।স্বাস্থ্য বিভাগের একজন কর্মকর্তা জানান, ‘এটি একটি ভাইরাল ইনফেকশন। আমরা বিষয়টি কেন্দ্রীয় স্বাস্থ্য অধিদপ্তরেও জানিয়ে দিয়েছি। প্রয়োজন হলে বিশেষজ্ঞ টিম মাঠে নামবে।’স্থানীয়রা বলছেন, জ্বর ও ব্যথার এই অজানা রোগ এখন সাধারণ অসুখের মতো দেখা দিলেও সেটি যাতে মহামারী না হয়, সেজন্য সতর্ক হতে হবে সবাইকে। প্রশাসনের উচিত, দ্রুত এ রোগ নির্ণয়ে বিশেষজ্ঞ মেডিকেল টিম পাঠানো এবং সচেতনতামূলক কার্যক্রম জোরদার করা।এআই

Source: সময়ের কন্ঠস্বর

সম্পর্কিত সংবাদ
ফিলিস্তিন রাষ্ট্রের স্বীকৃতি আরেকটি প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে – কে এটি পরিচালনা করবে?
ফিলিস্তিন রাষ্ট্রের স্বীকৃতি আরেকটি প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে – কে এটি পরিচালনা করবে?

বিশ্বের ১৫০টিরও বেশি দেশ এর আগে ফিলিস্তিনি রাষ্ট্রকে স্বীকৃতি দিয়েছিল, তবে এই তালিকায় যুক্তরাজ্য এবং অন্যান্য দেশের যোগ হওয়াকে অনেকেই Read more

বাবার বাড়ি যাওয়া হলো না রিতুর, সড়কেই লাশ
বাবার বাড়ি যাওয়া হলো না রিতুর, সড়কেই লাশ

যশোরে স্বামীর মোটরসাইকেল করে পিতার বাড়ি যাওয়ার পথে দুর্ঘটনায় রিতু (২০) এক নববধূর মৃত্যু হয়েছে। শুক্রবার (৯ মে) রাত ৮ টার Read more

উলিপুরে গভীর রাতে সিঁধ কেটে চুরি, নগদ দুই লাখ টাকা লুট
উলিপুরে গভীর রাতে সিঁধ কেটে চুরি, নগদ দুই লাখ টাকা লুট

কুড়িগ্রামের উলিপুর গভীর রাতে সিঁধ কেটে চুরির ঘটনা ঘটেছে। শনিবার (২৮ মার্চ) দিবাগত রাত আনুমানিক ২টার দিকে উপজেলার বেগমগঞ্জ ইউনিয়নের Read more

১১ মাস পর হাজার কোটি টাকার শেয়ার লেনদেন
১১ মাস পর হাজার কোটি টাকার শেয়ার লেনদেন

এগারো মাস পর গতকাল বৃহস্পতিবার ঢাকার শেয়ারবাজার ডিএসইতে মোট শেয়ার কেনাবেচার পরিমাণ হাজার কোটি টাকা ছাড়িয়েছে। কেনাবেচা হওয়া শেয়ারের মোট Read more

রাজশাহীতে ট্রেনের বগি লাইনচ্যুত
রাজশাহীতে ট্রেনের বগি লাইনচ্যুত

রাজশাহী রেলওয়ে স্টেশনে ঢালারচর এক্সপ্রেস ট্রেনের দুটি বগি লাইনচ্যুত হয়েছে। মঙ্গলবার (২১ অক্টোবর) রাত ১০টায় সর্বশেষ খবর পাওয়া পর্যন্ত ট্রেনের উদ্ধারকাজ Read more

শাকিবের সাথে কাজ করার আগ্রহ প্রকাশ করলেন সুস্মিতা
শাকিবের সাথে কাজ করার আগ্রহ প্রকাশ করলেন সুস্মিতা

ঢালিউডের জনপ্রিয় অভিনেতা সিয়াম আহমেদ বরাবরই পর্দায় নতুনত্ব নিয়ে হাজির হতে পছন্দ করেন। এবারের ইদুল ফিতরেও তার ব্যতিক্রম হয়নি। বড় Read more

আমরা নিরপেক্ষ নই ,    জনতার পক্ষে - অন্যায়ের বিপক্ষে ।    গণমাধ্যমের এ সংগ্রামে -    প্রকাশ্যে বলি ও লিখি ।   

NewsClub.in আমাদের ভারতীয় সহযোগী মাধ্যমটি দেখুন