চেহারায় এক শান্ত-সন্তুষ্ট হাসি। হাতে কিছু শিশুদের বই, আর ছোট্ট একটি ব্যাগে কলম, ব্রাশ আর সেলাইয়ের সুই। দেখে মনে হতে পারে, এই বৃদ্ধ মানুষটি কেবল একজন সাধারণ হকার। শহরের অলিতে-গলিতে ঘুরে বেড়ানো এক নিরীহ বিক্রেতা।কিন্তু এই সাধারণ চেহারার আড়ালে লুকিয়ে আছে জীবনভর সংগ্রাম করে এক অসাধারণ জীবনের গল্প। তবে তার সবচেয়ে বড় গর্ব, ছেলে এখন পড়াশোনা করছে দেশের সর্বোচ্চ বিদ্যাপীঠ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে।বৃদ্ধ এই মানুষটির নাম মো. আব্বাস আলী (৬৫)। বাড়ি নীলফামারী জেলার ডোমার উপজেলার হাড়িনচড়া ইউনিয়নের শ্যাডগাড়ি গ্রামে। পেশায় একজন ভ্রাম্যমাণ বিক্রেতা। ছোট্ট শিশুদের জন্য বই, কলম, ব্রাশ ও সেলাইয়ের সুই এসবই তার পণ্যের ঝুলি। আর এই সামান্য পণ্য বিক্রি করেই তিনি চালিয়ে যাচ্ছেন পরিবারের খরচ।প্রতিদিন নয়, শুধু হাটের দিনে বাজারে গিয়ে ঘুরে ঘুরে ওই সমস্ত পণ্য বিক্রি করেন তিনি। যা প্রতিটা বইয়ের ধরন অনুযায়ী ২০ থেকে ৫০ টাকা, প্রতি পিস কলম ৫ টাকা, ব্রাশ ২০ টাকা ও সুই বিক্রি করে থাকে ৫ টাকা করে। তবুও কখনো পেশা বদলাননি, কখনো কষ্টে ভেঙে পড়েননি।মো. আব্বাস আলী বলেন, ‘আমি দীর্ঘ ৪০ বছর ধরে এই কাজ করছি। ১৬ বছর বালিশ ছাড়া ঘুমিয়েছি। অনেক কষ্ট করছি, এখনো করে যাচ্ছি। প্রতিদিন সকালে হাতের ঝুলিতে কলম, ব্রাশ আর কিছু বই এই দিয়েই আমার যুদ্ধ শুরু। জেলার বিভিন্ন হাট বাজারে গিয়ে এই সমস্ত পণ্য বিক্রি করে থাকি। এখনো এক হাট থেকে অন্য হাটে ছুটে যাই। কত রোদ, কত বৃষ্টি তার পরেও থেমে থাকিনি।’তিনি আরও বলেন, ‘এই সমস্ত বিক্রি করেই আজ ছেলেকে পড়া-লেখা করাচ্ছি। এখন আমার ছেলে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ে। এই পণ্য বিক্রি করেই ছেলেকে চালাই। মাসে ১২০০ টাকার মতো দিই ওকে। আর এক মেয়ে বাড়িতে আছে। আমি চাই ছেলে বড় হোক, মানুষের মতো মানুষ হোক।’শুধুমাত্র বই, কলম ও ব্রাশ-সুই বিক্রি করে যখন তিনি ছেলের বিশ্ববিদ্যালয়ের খরচ চালান, তখন প্রশ্ন জাগে—এত অল্পে কীভাবে চলে?তার উত্তরে তিনি বলেন, ‘আমি নিজের জন্য কিছু চাই না, ছেলের জন্য চাই। ও যেন ভালো মানুষ হয়। এটাই আমার চাওয়া।’রামগঞ্জ হাটের এক ক্রেতা শহিদুল ইসলাম বলেন, ‘আমি অনেক সময় প্রয়োজন না থাকলেও আব্বাস চাচার কাছ থেকে কিছু না কিছু কিনি। কারণ উনার মতো সৎ আর পরিশ্রমী মানুষ আজকাল খুব কম দেখা যায়। এই বয়সে এসে অনেকেই যখন সমাজ বা পরিবারের কাছে হাত পাতেন, কেউ কেউ ভিক্ষাবৃত্তিকেই বেছে নেন জীবিকার পথ হিসেবে। তখন আব্বাস চাচা সে পথে হাঁটেননি। তিনি বিশ্বাস করেন, পরিশ্রমই মানুষের আসল পরিচয়।’এসআর
Source: সময়ের কন্ঠস্বর
