By: Daily Janakantha

তৃতীয় মেয়াদের চতুর্থবর্ষে প্রধানমন্ত্রীর ভাষণ

চতুরঙ্গ

10 Jan 2022
10 Jan 2022

Daily Janakantha

শেখ হাসিনার নেতৃত্বে¡ আওয়ামী লীগ টানা তৃতীয় দফায় ক্ষমতাসীন হয়ে তৃতীয়বর্ষ শেষ করে চতুর্থবর্ষে পদার্পণ করেছে। এ উপলক্ষে গত ৭ জানুয়ারি ২০২২ সন্ধ্যা ৭টায় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা জাতির উদ্দেশে গণমাধ্যমে ভাষণ দিয়েছেন। বিগত ১৩ বছরে সরকারের সাফল্যের নানা দিক তুলে ধরে ভবিষ্যত পরিকল্পনার কথাও ব্যক্ত করেছেন সরকারপ্রধান। যদিও সরকার গঠনের বছরান্তেই একটি করে ভাষণ দিয়ে আসছেন। এটা গণতান্ত্রিক রেওয়াজ হিসেবেই বিবেচিত। ২০১৯ সালের ৭ জানুয়ারি শেখ হাসিনার নেতৃত্বে¡ তৃতীয় দফায় বর্তমান সরকারের যাত্রা শুরু হয়। সে হিসাবে সরকার তৃতীয়বর্ষ শেষ করে ৪র্থবর্ষে পদার্পণ করেছে। গত এক বছর সরকারের কর্মকা-ের পাশাপাশি বিগত বছরগুলোর সাফল্যও বক্তৃতায় উঠে এসেছে। ভাষণটি দীর্ঘ না হলেও সংক্ষিপ্ত আকারে মূল বিষয়গুলো তুলে এনেছেন। শেখ হাসিনা আমাদের জাতির জনক বঙ্গবন্ধুর কন্যা। নানা ঘাত-প্রতিঘাতের মধ্য দিয়ে তিনি রাজনীতির পথে হাঁটতে হাঁটতে নিজেকে শক্তিশালী প্রজ্ঞাবান রাজনীতিক হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করতে সক্ষম হয়েছেন। তিনি এখন কেবল বাংলাদেশ নয়, সারাবিশ্বের বিস্ময় হয়ে বাঙালী জাতিকে আত্মমর্যাদাশীল জাতি হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছেন। বিশ্ববাসী অবাক বিস্ময়ে বাংলাদেশের দিকে তাকিয়ে থাকে। বিশ্বের মানবজাতির কল্যাণে শেখ হাসিনা নবতর দর্শন উপস্থাপন করে বিশ্ব সভায় প্রশংসা কুড়িয়েছেন। সেইসঙ্গে বাঙালী জাতি ও বাংলাদেশকে অন্য এক উচ্চতায় পর্যবসিত করতে পেরেছেন। এ এক গৌরবের বিষয়, অহঙ্কারের বিষয়।
বর্তমান বিশ্ব সভ্যতা এক সঙ্কটকাল অতিক্রম করছে। অচেনা ভাইরাস মহামারী করোনার ছোবলে বিশ্ব অর্থনীতি ল-ভ-। বিগত দুটো বছর করোনার সঙ্গে যুদ্ধ করে মানবজাতির জীবনপ্রবাহ অনেকটাই বর্ণহীন। পৃথিবীর বিভিন্ন দেশ এই ভাইরাসের সঙ্গে বিভিন্ন কৌশলে যুদ্ধ করছে। প্রকৃতির নিয়মানুসারে ভাইরাসও তার কৌশল বদলাচ্ছে বিভিন্নভাবে। রূপের বিভিন্নতার নানা নামে উপস্থিত হচ্ছে মানুষের দেহে। করোনাভাইরাসের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করতে অস্ত্র হিসেবে ভ্যাকসিনও আবিষ্কার করে ফেলেছে জীবশ্রেষ্ঠ মানবজাতি। পৃথিবীর প্রায় সব দেশই টিকার আওতায় এসে পড়েছে। তারপরও করোনাকে পরাস্ত করা সম্ভব হচ্ছে না। ওমিক্রন নামক নতুন ভাইরাস আগ্রাসী হচ্ছে সারাবিশ্বে। ভাইরাস আক্রমণের এটা তৃতীয় ঢেউ হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে। এই ঢেউ কতটা ভয়ঙ্কর হবে ইতোমধ্যে তার আভাস মিলছে। দ্বিতীয় ডোজ টিকা নেয়ার পরও মানুষ আক্রান্ত হচ্ছে ওমিক্রনে। তবে আশার কথা এই যে, ওমিক্রন দ্রুত সংক্রমণ ক্ষমতা রাখলেও ভয়ঙ্কর প্রাণঘাতী নয় বলে বিশ্লেষকরা মত দিয়েছেন। তারপরও আমাদের সতর্ক থাকতে হবে। মেনে চলতে হবে স্বাস্থ্যবিধি। প্রধানমন্ত্রী তার ভাষণের প্রারম্ভেই করোনাভাইরাস সতর্কতার কথা উপস্থাপন করেছেন।
প্রধানমন্ত্রী বিগত দিনের উন্নয়নের চিত্র উপস্থাপন করে আগামীর রূপকল্প বাস্তবায়নে সরকার কী কী পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে তাও স্পষ্ট করেছেন। বঙ্গবন্ধুর স্বপ্নের সোনার বাংলায় মানুষের মুখে যেন সব সময় হাসি থাকে এমন পরিবেশ নিশ্চিত করতে কাজ করে যাচ্ছে সরকার। করোনা মোকাবেলা করে অর্থনীতির চাকা কিভাবে সচল রাখতে সক্ষম হয়েছেন তার বর্ণনাও দিয়েছেন তিনি। কৃষি, শিল্প, বাণিজ্য, খাদ্য, বিদ্যুত ও পল্লী উন্নয়নের পরিসংখ্যানভিত্তিক চিত্র তুলে ধরেছেন ভাষণে। আগামীতে বিদ্যুত খাতকে আরও বিজ্ঞানভিত্তিক আধুনিকায়নের লক্ষ্যে স্বল্প ও দীর্ঘমেয়াদী প্রকল্প গ্রহণ করেছে সরকার, যা থেকে দেশীয় চাহিদা মিটিয়ে বিদেশেও রফতানি করা সম্ভব হবে বিদ্যুত। ২০২১ সালে বাংলাদেশের সুবর্ণজয়ন্তীতে উন্নয়নশীল দেশের মর্যাদায় অভিষিক্ত হওয়াটা বিশেষ গৌরবের। সেইসঙ্গে মুজিব শতবর্ষ পালনের মধ্য দিয়ে বিশ্ববাসীকে জানান দিতে পেরেছি যে, আমাদের ইতিহাস, ঐতিহ্য কতটা সমৃদ্ধিশালী। ২০৩০ সালে বৃহত্তর অর্থনৈতিক দেশ হিসেবে বিশ্বে বাংলাদেশের অবস্থান হবে নবম। ২০৪১ সালে সমৃদ্ধিশালী উন্নত দেশের তালিকায় স্থান পাওয়ার আশায় কাজ চলমান। কিন্তু দেশ যেভাবে এগিয়ে যাচ্ছে তাতে হয়ত ২০৪১ সালের আগেই উন্নত সমৃদ্ধ দেশ হিসেবে বিকশিত হবে বাংলাদেশ। সুখী-সমৃদ্ধিশালী অসাম্প্রদায়িক গণতান্ত্রিক বাংলাদেশ গড়ার প্রত্যয়ে শেখ হাসিনার সরকার কাজ করে যাচ্ছে।
আজকের প্রজন্ম আগামীর ভবিষ্যত। তাদের বিজ্ঞানমনস্ক করে গড়ে তুলতে নানাবিধ প্রকল্প হাতে নেয়া হয়েছে। ২০২২ সালের মধ্যে নিজস্ব অর্থায়নে স্বপ্নের পদ্মা সেতু উন্মুক্ত হবে। চালু হবে কর্ণফুলী টানেল ও মেট্রোরেল। বড় বড় মেগা প্রকল্প বাস্তবায়ন হলে পাল্টে যাবে দেশের দৃশ্যপট। জিডিপি বেড়ে যাবে বহুলাংশে। মাথাপিছু গড় আয়, সেইসঙ্গে মানুষের গড় আয়ুও বৃদ্ধি পাবে। দারিদ্র্যের হার এখন ১৫.৬। অতি দরিদ্র ৬-এর নিচে। যে সমস্ত পরিকল্পনা হাতে নেয়া হয়েছে তা যথাযথভাবে বাস্তবায়ন করা সম্ভব হলে ২০৩০ সালের মধ্যে দারিদ্র্য নেমে আসবে প্রায় শূন্যের কোঠায়। পৃথিবীতে চতুর্থ শিল্পবিপ্লব শুরু হয়েছে। এই চতুর্থ শিল্পবিপ্লবের চ্যালেঞ্জ গ্রহণ করে কাজ করছে সরকার। ইতোমধ্যে ৫জি-তে পৌঁছে গেছে দেশ। সব সূচকেই এগিয়ে রয়েছে বাংলাদেশ। এত সাফল্য, এত উন্নয়নের মাঝেও প্রধানমন্ত্রীর ভাষণে একটি শঙ্কার কথা প্রকাশিত হয়েছে। তা হচ্ছে দেশবিরোধী চক্রান্ত বা ষড়যন্ত্র। দুর্নীতিও একটি ষড়যন্ত্র। তিনি দুর্নীতির বিরুদ্ধে সামাজিক আন্দোলন গড়ে তোলার আহ্বান জানিয়েছেন।
উল্লেখ্য, স্বাধীন সার্বভৌম বাংলাদেশের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র নতুন কোন ঘটনা নয়। স্বাধীনতার ঊষালগ্ন থেকেই এ ষড়যন্ত্র শুরু। সরকারের অভ্যন্তরে ঘাপটি মেরে থাকা ষড়যন্ত্রকারীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়া খুবই জটিল ও কষ্টসাধ্য ব্যাপার। যারা অতিদ্রুত সরকারের দৃষ্টি আকর্ষণে বাস্তব সত্যকে আড়াল করে অতিমাত্রায় মুজিবভক্ত হিসেবে নিজেকে মেলে ধরছে তাদের থেকে সতর্ক ও সাবধান থাকতে হবে। সরকারপ্রধানের কাছ থেকে ষড়যন্ত্রের কথা উচ্চারণ খুবই ভাববার বিষয়। দেশে-বিদেশে একটি গোষ্ঠী রয়েছে যাদের কাজই হচ্ছে ষড়যন্ত্র করা। সরকারকে বিতর্কিত করা। অসংখ্য লোক রয়েছে যারা নিয়মিত সরকারবিরোধী কর্মকা-ে লিপ্ত। প্রধানমন্ত্রী বলেছেন, ২০২২ সাল হবে ‘অবকাঠামো উন্নয়নের মাইলফলক।’ তিনি দুঃখ করে এও বলেছেন যে, ‘দেশে-বিদেশে একশ্রেণী আছে, যারা সরকারের ভাবমূর্তি নষ্ট করছে। সরকারের উন্নয়ন তাদের চোখে পড়ছে না। নানাভাবে মিথ্যা তথ্য দিয়ে বিভ্রান্ত করছে। বিদেশীদের কাছে ভুল বার্তা পৌঁছে দিচ্ছে। আন্তর্জাতিকভাবে দেশের মর্যাদা ক্ষুণœœ করছে।’ নির্মোহ সত্য কথাই তিনি বলেছেন। যারা দেশকে ও দেশের মানুষকে ভালবাসে না তারা সব সময় নেতিবাচক প্রপাগা-া করবে এটাই স্বাভাবিক। তাই সতর্ক থাকতে হবে জনগণকে। অন্যদিকে বিদেশে লবিষ্ট নিয়োগ করে দক্ষ কূটনীতিক কর্মকা-ের মাধ্যমে এসব প্রপাগা-া প্রতিহত করতে হবে।
প্রধানমন্ত্রীর প্রদত্ত ভাষণে অন্তর্দৃষ্টি সম্পন্ন পর্যালোচনার বিষয় খুব স্পষ্ট। মনের গভীরতম স্থানে যে প্রজ্ঞার পরিচয় তিনি দিয়েছেন তা জাতির কল্যাণের পথকে মসৃণ করবে। তিনি হিংসা-বিদ্বেষের পথ পরিহার করে শক্তিশালী জাতি গঠনে সকলকে ভূমিকা রাখার আহ্বান জানিয়েছেন। আজকাল মনস্তত্ত্বের ক্ষেত্রে পূর্ব ও পশ্চিমের মধ্যে একটা সুন্দর মিলন সেতু রচিত হয়েছে। সেই প্রেক্ষিতে প্রধানমন্ত্রীর ভাষণ প্রভূত তাৎপর্যমণ্ডিত।
বিশ্ব সভায় প্রধানমন্ত্রী প্রায়ই বলে থাকেন, পারস্পরিক সহায়তা ছাড়া কোন অগ্রগতি হয় না। মানুষের যথার্থ মুক্তিও আসে না। পরস্পরে ধ্বংসাত্মক কাজ করলে উভয়ের বিনাশ অনিবার্য। শেখ হাসিনার এমন সত্য দর্শনের বিষয় নিয়ে বিশ্বের অনেকেই নতুন করে ভাবছেন। নারীর ক্ষমতায়ন ও নারী জাগরণের বিষয়ে গুরুত্ব দিয়ে আসছেন।
যে মহান সত্য বাংলাদেশকে প্রেরণা জোগাতে পারে সেসব সত্যই প্রধানমন্ত্রী তার ভাষণে তুলে ধরেছেন। স্বাধীনতা ও বিজয়ের পঞ্চাশ বছরে আমরা কী সাফল্য অর্জন করেছি, কী পারিনি সেই চিত্র বর্ণনা করে উঁচু স্তরের লোকদের স্বার্থকেন্দ্রিক না হওয়ার আহ্বান জানিয়ে জনকল্যাণের চেষ্টায় আরও আন্তরিক ও যতœবান হওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী। গ্রামাঞ্চল উন্নয়নে অর্থাৎ শহুরে নাগরিক সুবিধা যেন গ্রামেও পৌঁছে যায় সে পরিকল্পনা নিয়েও অগ্রসর হচ্ছেন প্রধানমন্ত্রী।

লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক
phani.sarker@gmail.com

The Daily Janakantha website developed by BIKIRAN.COM

Source: জনকন্ঠ

সম্পর্কিত সংবাদ
পুকুরের পানিতে ডুবে দুই শিশুর মৃত্যু

নাটোরের লালপুরে পুকুরের পানিতে ডুবে দুই শিশুর মৃত্যু হয়েছে। বুধবার (১৭ আগস্ট) বিকেলে উপজেলার কৃষ্ণ রামপুর গ্রামে এ দুর্ঘটনা ঘটে।

হচ্ছে না ব্রাজিল-আর্জেন্টিনার বিশ্বকাপ বাছাই ম্যাচ

গত বছর আর্জেন্টিনা ও ব্রাজিলের মধ্যে স্থগিত হওয়া বিশ্বকাপ বাছাইপর্বের ম্যাচ নতুন করে হবে না। মঙ্গলবার আর্জেন্টাইন ফুটবল ফেডারেশন (এএফএ) Read more

ঘন ঘন লোডশেডিংয়ের কবলে চীনের ৫০ লাখ মানুষ

দক্ষিণ-পশ্চিম চীনের ৫০ লাখ মানুষ ঘন ঘন লোডশেডিংয়ের কবলে পড়ছে। তাপপ্রবাহের কারণে বিদ্যুতের চাহিদা বেড়ে যাওয়ায় এই পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে।

ইসরায়েল ৫০টি ‘হলোকস্ট’ চালিয়েছে বলায় মাহমুদ আব্বাসের নিন্দা

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় নাৎসি জার্মানি ইউরোপে গণহারে যে ইহুদী নিধন চালিয়েছিল, সেটিকে 'হলোকস্ট' বলে বর্ণনা করা হয়। ফিলিস্তিনিদের বিরুদ্ধে ইসরায়েল Read more

সিরাজগঞ্জে তাঁত শিল্পে ধস 

৫০ কাউন্টের এক বস্তা সুতা এক বছর আগেও ছিল ১৪ হাজার ৫০০ টাকা, এখন সেই সুতার বস্তা ২২ হাজার ২০০ টাকা।

অর্থনৈতিক সংকট কাটিয়ে ওঠার শক্তি বাংলাদেশের আছে: আইএমএফ

অর্থনৈতিক সংকট কাটিয়ে ওঠার শক্তি বাংলাদেশের আছে বলে জানিয়েছে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ)। 

আমরা নিরপেক্ষ নই ,    জনতার পক্ষে - অন্যায়ের বিপক্ষে ।    গণমাধ্যমের এ সংগ্রামে -    প্রকাশ্যে বলি ও লিখি ।   

NewsClub.in আমাদের ভারতীয় সহযোগী মাধ্যমটি দেখুন