৭২ বছর বয়সেও থেমে নেই জীবনযুদ্ধ। বয়সের ভারে নুজ্ব। শরীর নুইয়ে পড়েছে, কপালে বার্ধক্যের গভীর ভাঁজ। যে বয়সে নাতি-নাতনিদের নিয়ে বাড়িতে গল্পগুজব করে অবসরে সময় কাটানোর কথা, সেই বয়সে জীবনযুদ্ধের কঠিন বাস্তবতাকে সঙ্গী করে পথে নেমেছেন এক বৃদ্ধ। পিঠে ঝোলানো হাওয়াই মিঠাইয়ের কাঁচের বাক্স, হাতে লম্বা কাঠি—তাতেই ঝুলছে রঙিন হাওয়ায় মিষ্টি এই সামান্য পুঁজিতেই কিশোরগঞ্জের অলিগলি আর জনবহুল এলাকাতে ঘুরে ফেরি করে সংসার টিকিয়ে রাখার চেষ্টা করে যাচ্ছেন বৃদ্ধ আব্দুর রশিদ। ​রঙিন মিঠাইয়ের আড়ালে ধূসর জীবনের কালো ছায়া আব্দুর রশিদ সকাল হতে না হতেই শুরু করে তাঁর নিত্যদিনের পথচলা। কাঁধে বাঁশের লাঠিতে ঝোলানো বাক্সে সাজানো থাকে গোলাপি রঙের হাওয়াই মিঠাই। শিশুদের কাছে যা এক টুকরো রঙিন মেঘের মতো আনন্দের, সেই মিঠাই ফেরি করা মানুষটির জীবন কিন্তু মোটেও রঙিন নয়। তীব্র রোদ কিংবা ঝড় বৃষ্টি কোনো কিছুই তাঁকে ঘরে আটকে রাখতে পারে না। কারণ ঘরে তাঁর পথ চেয়ে বসে থাকে অভাবী সংসারের সদস্যরা। এভাবেই অভাবের তাড়নায় বিরামহীন পথচলা​অনুসন্ধানে জানা যায়, জামালপুর জেলার মাদারগঞ্জ উপজেলার গুণেরতলা গ্রামের বাসিন্দা আব্দুর রশিদ এখন থাকেন কিশোরগঞ্জ রেলওয়ে স্টেশনের পাশে একটি ভাড়া বাসায়। বয়সের ভারে শরীর নুয়ে পড়লেও দায়িত্বের ভার তাকে থামতে দেয়নি। তাই গ্রামের ভিটেমাটি ছেড়ে পাড়ি জমিয়েছেন শহরে—শুধু দুবেলা খাবারের নিশ্চয়তার আশায়। প্রতিদিন সকালে শহরে ঘুরে ঘুরে তিনি এই মিঠাই বিক্রি করেন। সারাদিন হাড়ভাঙা খাটুনি শেষে যা আয় হয়, তা দিয়ে কোনোমতে চাল-ডাল আর স্ত্রীর ওষুধের খরচ জোটে।সরেজমিনে জেলা শহরের গুরুদয়াল মুক্তমঞ্চ এলাকায় গিয়ে দেখা যায় দেখা মেলে তার। আশপাশে মানুষের আনাগোনা, ব্যস্ততা—কিন্তু সেই ভিড়ের মাঝেও তিনি আলাদা। কারণ তার হাঁটা ধীর, কণ্ঠ ক্লান্ত, আর চোখে স্পষ্ট এক ধরনের নিরুপায় নীরবতা। জীবনযুদ্ধে হার না মানা এক সৈনিক ​প্রতিটি দরজায় কড়া নেড়ে তিনি খুঁজে ফেরেন ক্রেতা। তাঁর এই সংগ্রামী জীবন সমাজের এক নির্মম চিত্র তুলে ধরে। তবুও তিনি হার মানতে নারাজ। যতক্ষণ শরীরে শেষ রক্তবিন্দু আছে, ততক্ষণ তিনি ঘাম ঝরিয়ে উপার্জন করতে চান।হাওয়াই মিঠাই একপ্রকার মিষ্টিজাতীয় খাদ্য। এটি মুখে দিলে দ্রুত মিলিয়ে যায় বলে এর নাম হাওয়াই মিঠাই। দেখতে এক টুকরো গোলাপি রং, যা যেন মিশে আছে একটি পকেটের ভেতর। শিশুরা সবচেয়ে বেশি পছন্দ করে এটি। তবে অনেক সময় বড়দেরকেও শখ করে এটি খেতে দেখা যায়। চিনিকে তাপ দিয়ে গলিয়ে তা একটি হাতে ঘোরানো জাঁতায় পিষে অল্প সময়ে তৈরি করা হয় হাওয়াই মিঠাই। শহর-গ্রামে সবখানেই মেলা বসলেই দেখা মেলে হাওয়াই মিঠাইয়ের।বৃদ্ধ আব্দুর রশিদেট ‘হাওয়াই মিঠাই’ বিক্রি করতে দেখে অনেকেই স্মৃতিকাতর হয়ে ওঠেন, মনে পড়ে ছোটবেলার কথা। এমনই একজন কিশোরগঞ্জ সদর উপজেলার যশোদল ইউনিয়নের ভূবিরচর গ্রামের বাসিন্দা সবুজ মিয়া। সবুজ মিয়া বলেন, ছোটবেলার সেই ‘হাওয়াই মিঠাই’য়ের স্বাদ এখনো মনে আছে। তাই এখনো ‘হাওয়াই মিঠাই দেখলেই কিনে বান্ধবীদের সঙ্গে তাল মিলিয়ে মজা করে খাই। ছোটবেলায় বাবার সঙ্গে বাজার করতে গেলে প্রথমেই হাওয়াই মিঠাইয়ের বায়না ধরতাম। মুগ্ধ হয়ে দেখতাম, চিনিকে তাপ দিয়ে গলিয়ে একটি হাতে ঘোরানো ‘জাঁতা’য় পিষে অল্প সময়ে তৈরি হচ্ছে ‘হাওয়াই মিঠাই’। কী মধুরই না ছিল সেই সব দিনগুলি! তাইফা সাইফ দোলা​ বলেন, “এক সময় তো চারপাশেই হাওয়াই মিঠা পাওয়া যেত, কিন্তু এখন আর চোখেই পড়ে না। আজ মুক্তমঞ্চে ঘুরতে এসে যখন হঠাৎ এটি দেখলাম, তখন আর লোভ সামলাতে পারলাম না। আসলে ছোটবেলায় আমরা প্রচুর হাওয়াই মিঠা খেতাম; সেই স্বাদটা আজও ভোলার নয়। অনেকদিন পর এটি খাওয়ার সুযোগ পেয়ে মনটা সত্যিই আনন্দে ভরে গেছে।”তাবাসসুম এনাম বর্ষা বলেন, “ছোটবেলায় দেখতাম বাসার আশেপাশে ফেরিওয়ালারা হাওয়াই মিঠা নিয়ে আসত। কত খেয়েছি তখন! কিন্তু এখন আর তেমন দেখা যায় না। অনেকদিন পর আজ দেখে খুব ভালো লাগল, তাই আমরা বোনেরা মিলে কিনে খেলাম। এটি খাওয়ার সময় বারবার ফেলে আসা শৈশবের স্মৃতিগুলোই মনে পড়ছিল।”উম্মি হক লিয়া বলেন, “আগে সবসময়ই হাতের নাগালে হাওয়াই মিঠা পাওয়া যেত, এখন একদমই দেখা যায় না। আজ বোনদের সাথে মুক্তমঞ্চে ঘুরতে এসে দেখি এক বিক্রেতা এটি নিয়ে বসে আছেন। দেখেই সেই পুরনো দিনের কথা মনে পড়ে গেল, যখন রাস্তায় দেখলেই মা-বাবার কাছে খাওয়ার জন্য বায়না ধরতাম। মা-বাবাও কিনে দিতেন। সেই স্মৃতিগুলো মনে পড়তেই আমরা বোনেরা মিলে কিনে খেলাম, খুব ভালো লাগছে।”​খলিলুর রহমান বলেন, “আমাদের ছোটবেলাটা ছিল অন্যরকম। ঝুনঝুনির শব্দ শুনলেই খেলা ফেলে দৌড়ে আসতাম। তখন আমরা পরিত্যক্ত টিনের কৌটা কিংবা লোহালক্কড়—যাকে আমরা ভাঙাড়ি বলি—সেগুলো দিয়ে বিনিময়ে হাওয়াই মিঠা বা ‘কটকটি’ নিতাম। আজকের প্রজন্ম তো এসব কল্পনাও করতে পারবে না। এই কলেজ মাঠে এসে যখন এটি খাচ্ছি, তখন শৈশবের সেই আবেগ আর স্মৃতিগুলো আমায় আবেগপ্রবণ করে তুলছে।”​সোহাগ বলেন, “আগে তো আমরা বাড়িতে কত কিছু দিয়ে বিনিময়ে এটা খেতাম। এখন এটি মেলা বা বিশেষ জায়গা ছাড়া পাওয়াই যায় না। মুক্তমঞ্চে চাচার সাথে ঘুরতে এসে হঠাৎ এটার দেখা পাওয়াটা ছিল এক অসাধারণ ব্যাপার। শৈশবের সেই পুরনো দিনের স্মৃতিগুলো আজ যেন নতুন করে জীবন্ত হয়ে উঠল।”কিশোরগঞ্জ পৌর মহিলা কলেজের সহকারী অধ্যাপক সাদেকুর রহমান বলেন, হাওয়াই মিঠাই খেতে পছন্দ করেন না এমন মানুষ খুবই কম। খাবারটি সব বয়সের মানুষ পছন্দ করলেও শিশুদের কাছে তা জনপ্রিয়তার শীর্ষে। কিন্তু পিৎজা, হটডগসহ নানা আধুনিক খাবারের ভিড়ে ঐতিহ্যবাহী এ খাবারটি হারিয়ে যেতে বসেছে। আগে সব জায়গায় বিক্রি করতে দেখা গেলেও এখন আর তেমনটি হয় না। তাই আবারও বাঙালি সংস্কৃতির ঐতিহ্যবাহী খাবারটি ফিরিয়ে আনতে প্রয়োজনীয় উদ্যাগ নেয়া খুবই জরুরি।এই বয়সে আর কাজ করতে ইচ্ছা করে না,” ধীর কণ্ঠে আব্দুর রশিদ বলেন, শরীরে আগের মতো বল পাই না, অল্প হাঁটলেই বুক ধড়ফড় করে। কিন্তু ঘরে বসে থাকলে তো হাঁড়ি চড়বে না। এক সময় আমার দিনকাল অন্যরকম ছিল বড় করে মহিষের ব্যবসা করতাম, সাথে হালের আবাদও ছিল। তবে জীবন তো আর এক জায়গায় থেমে থাকে না। এখন বয়স হয়েছে, তাই আবাদের কঠিন পরিশ্রম ছেড়ে দিয়েছি। নিজের আবাদী জমি এখন না থাকলেও মাথা গোঁজার নিজস্ব ভিটেমাটিটুকু আছে।তিনি আরও বলেন, ​আমার তিন সন্তান—দুই মেয়ে আর এক ছেলে। মেয়েদের বিয়ে দিয়েছি, তারা এখন যার যার সংসারে। ছেলে এখন নিজের মতো কাজ করে, গরু পালে। আমি চেয়েছি এই বয়সেও যেন কারো ওপর বোঝা হয়ে না থাকি, তাই নিজের উপার্জনে আলাদাভাবেই চলি। ​এখন জামালপুরের বাইরে যেখানে আছি, এখানকার মানুষজন খুব ভালো। কোনো ঝামেলা নেই, শান্তিতে ব্যবসা করা যায়। প্রতিদিন সকাল ৯টার দিকে বাসা থেকে হাওয়াই মিঠাই বিক্রির জন্য বের হয়। বিকেল ৪টা পর্যন্ত বিক্রি করি।এই শহরের হাজারো মানুষের ভিড়ে আব্দুর রশিদের মতো মানুষরা প্রায় অদৃশ্য। অথচ তাদের প্রতিদিনের সংগ্রামই আমাদের চোখে দেখায়—বৃদ্ধ বয়স মানেই সবসময় বিশ্রাম নয়, অনেকের জন্য সেটাই সবচেয়ে কঠিন সময়। সমাজের একটু সহানুভূতি, সামান্য সহায়তা হয়তো বদলে দিতে পারে তার শেষ জীবনের গল্প।পিএম

Source: সময়ের কন্ঠস্বর

সম্পর্কিত সংবাদ
যশোরে পল্লী চিকিৎসকদের দোয়া ও ইফতার মাহফিল
যশোরে পল্লী চিকিৎসকদের দোয়া ও ইফতার মাহফিল

যশোরে নগর ও সদর উপজেলা পল্লী চিকিৎসকদের উদ্যোগে দোয়া ও ইফতার মাহফিল অনুষ্ঠিত হয়েছে। রবিবার সন্ধ্যায় মাতৃসেবা হাসপাতাল অ্যান্ড ডায়াগনস্টিক Read more

রাজধানী ছাড়িয়ে গ্রামীণ এলাকায় ছড়াচ্ছে ভয়াবহ ডেঙ্গু
রাজধানী ছাড়িয়ে গ্রামীণ এলাকায় ছড়াচ্ছে ভয়াবহ ডেঙ্গু

বাংলাদেশের স্বাস্থ্যখাতে ডেঙ্গুর নতুন আতঙ্ক তৈরি হয়েছে। যেখানে আগে এডিস মশাবাহিত রোগটি নগরকেন্দ্রিক ছিল, এবার তা ঢাকার বাইরের জেলা ও Read more

দেশে ডেঙ্গুতে প্রাণ গেল আরও ৩ জনের
দেশে ডেঙ্গুতে প্রাণ গেল আরও ৩ জনের

সারাদেশে ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়ে গত ২৪ ঘণ্টায় আরও ৩ জনের মৃত্যু হয়েছে। এ সময় ৬৮৫ জন হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন।রবিবার (১৪ Read more

১৮তম শিক্ষক নিবন্ধন পরীক্ষায় উত্তীর্ণদের ভুল তথ্য সংশোধনের সুযোগ
১৮তম শিক্ষক নিবন্ধন পরীক্ষায় উত্তীর্ণদের ভুল তথ্য সংশোধনের সুযোগ

১৮তম শিক্ষক নিবন্ধন পরীক্ষায় চূড়ান্তভাবে উত্তীর্ণ প্রার্থীদের জন্য ই-প্রত্যয়নপত্র ডাউনলোড ও তথ্য সংশোধনের প্রক্রিয়া শুরু করছে বেসরকারি শিক্ষক নিবন্ধন ও Read more

উখিয়ায় অস্ত্রধারী মাদক সিন্ডিকেটের গোপন বৈঠক
উখিয়ায় অস্ত্রধারী মাদক সিন্ডিকেটের গোপন বৈঠক

কক্সবাজারের উখিয়ার সীমান্তবর্তী এলাকায় সম্প্রতি বেড়ে গেছে অস্ত্রধারী মাদক কারবারিদের উৎপাত। স্থানীয়দের অভিযোগ, মাদক ও সন্ত্রাসী কার্যক্রমে প্রকাশ্যে অস্ত্র ব্যবহার Read more

এবার লোডশেডিং নিয়ে সুখবর দিলেন জ্বালানি উপদেষ্টা
এবার লোডশেডিং নিয়ে সুখবর দিলেন জ্বালানি উপদেষ্টা

গরমের তীব্রতা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে দেশে বিদ্যুতের চাহিদাও বেড়ে গেছে। এ কারণে সারা দেশেই লোডশেডিং করতে হচ্ছে। তবে গরমে লোডশেডিং Read more

আমরা নিরপেক্ষ নই ,    জনতার পক্ষে - অন্যায়ের বিপক্ষে ।    গণমাধ্যমের এ সংগ্রামে -    প্রকাশ্যে বলি ও লিখি ।   

NewsClub.in আমাদের ভারতীয় সহযোগী মাধ্যমটি দেখুন