উত্তরবঙ্গের যোগাযোগ ব্যবস্থায় বড় পরিবর্তনের সম্ভাবনা জাগানো সিরাজগঞ্জ–বগুড়া রেলপথ প্রকল্পটি বিকল্প অর্থায়নের অভাবে থমকে আছে। ২০১৮ সালে অনুমোদনের সাত বছর পার হলেও এখনো প্রকল্পটির নির্মাণকাজ শুরু হয়নি।সিরাজগঞ্জ–বগুড়া রেলপথ প্রকল্পটি ২০১৮ সালের ৩০ অক্টোবর জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটির (একনেক) বৈঠকে অনুমোদন পায়। তখন প্রকল্পটি বাংলাদেশ সরকার ও ভারতীয় ঋণের অর্থায়নে বাস্তবায়নের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। প্রাথমিকভাবে এ প্রকল্পের সম্ভাব্য ব্যয় ধরা হয়েছিল ৫ হাজার ৫৭৯ কোটি ৭০ লাখ টাকা। এর মধ্যে ভারতীয় লাইন অব ক্রেডিটের (এলওসি) আওতায় ৩ হাজার ১৪৬ কোটি ৫৯ লাখ ১০ হাজার টাকা ঋণ দেওয়ার কথা ছিল। প্রকল্পের মেয়াদ নির্ধারণ করা হয় ২০২৩ সালের ৩০ জুন পর্যন্ত।তবে পরামর্শক নিয়োগ ও নকশা চূড়ান্ত করতে বিলম্ব হওয়ায় নির্ধারিত সময়ের মধ্যে কাজ শুরু করা সম্ভব হয়নি। ২০২১ সালের ২৭ সেপ্টেম্বর ভারতীয় কর্তৃপক্ষ পরামর্শক নিয়োগ দেয়।এরপর ২০২৩ সালের ৩০ জুন চূড়ান্ত নকশা প্রণয়ন সম্পন্ন হয়। ফলে প্রকল্পের মেয়াদ বাড়িয়ে ২০২৬ সালের জুন পর্যন্ত করা হয়।এ সময়ের মধ্যে প্রকল্পের আওতায় সম্ভাব্যতা সমীক্ষা, বিস্তারিত নকশা প্রস্তুত এবং প্রয়োজনীয় জমির বেশিরভাগ অধিগ্রহণ সম্পন্ন হয়েছে। কিন্তু ২০২৪ সালের আগস্টে ছাত্র-জনতার আন্দোলনে আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার পর ভারত এ প্রকল্পের অর্থায়ন থেকে সরে দাঁড়ায়।এর পরিপ্রেক্ষিতে নতুন করে প্রকল্পটি বাস্তবায়নের উদ্যোগ নেয় বাংলাদেশ রেলওয়ে। সম্প্রতি সংস্থাটি একটি প্রাক্-উন্নয়ন প্রকল্প প্রস্তাব (পিডিপিপি) পরিকল্পনা কমিশনে পাঠিয়েছে। সেখানে সিরাজগঞ্জ–বগুড়া রেলপথ নির্মাণে প্রাক্কলন ব্যয় ধরা হয়েছে ১০ হাজার ৩৯১ কোটি টাকা। বর্তমান অন্তর্বর্তীকালীন সরকার বিকল্প অর্থায়নের খোঁজ শুরু করেছে।রেলওয়ে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, প্রকল্পটি বাস্তবায়ন হলে ঢাকা থেকে বগুড়া যাত্রায় সময় চার ঘণ্টারও বেশি কমবে। ডাবল লাইন নির্মাণ করা হলে এই পথে অর্ধশতাধিক ট্রেন চালানো সম্ভব হবে। এতে উত্তরবঙ্গের অন্তত আট জেলার মানুষ সরাসরি উপকৃত হবে। কৃষি ও অর্থনীতিতেও ইতিবাচক প্রভাব পড়বে।রেলওয়ে পরিকল্পনা দপ্তরের কর্মকর্তারা বলছেন, সিরাজগঞ্জ–বগুড়া রেলপথ নির্মাণ অত্যন্ত জরুরি। এটি রেলের জন্য দ্রুত সেবা ও ব্যয় সাশ্রয়ের একটি গুরুত্বপূর্ণ রুট। তাঁদের মতে, চাহিদা অনুযায়ী প্রকল্পটি ডাবল লাইনে নির্মাণ করা প্রয়োজন। এ জন্য ইতিমধ্যে জমি অধিগ্রহণে ১ হাজার ৯০০ কোটি টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে।জানা গেছে, অন্তর্বর্তীকালীন সরকার প্রকল্পটি বিকল্প অর্থায়নে বাস্তবায়নে আগ্রহী। এ বিষয়ে এশিয়ান ইনফ্রাস্ট্রাকচার ইনভেস্টমেন্ট ব্যাংক (এআইআইবি) ও এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক (এডিবি) মৌখিকভাবে ঋণ প্রদানে আগ্রহ দেখালেও এখনো আনুষ্ঠানিকভাবে কোনো চিঠি দেয়নি।রেলওয়ে কর্মকর্তারা জানান, প্রকল্প অনুমোদনের সাত বছর পেরিয়ে গেলেও এখন পর্যন্ত নির্মাণকাজের উদ্বোধন বা ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন হয়নি। ডাবল লাইন নির্মিত হলে ঢাকা থেকে উত্তরবঙ্গের দূরত্ব প্রায় ১৩০ কিলোমিটার কমবে। বর্তমানে সড়কপথে ঢাকা–বগুড়া যেতে সময় লাগে প্রায় ছয় ঘণ্টা, আর ট্রেনে লাগে ১০–১১ ঘণ্টা। নতুন রেলপথ চালু হলে বগুড়া থেকে সিরাজগঞ্জ হয়ে মাত্র পাঁচ ঘণ্টায় ঢাকায় পৌঁছানো সম্ভব হবে।রেলওয়ে পরিকল্পনা দপ্তরের এক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, শুরু থেকেই প্রকল্পটি ডাবল লাইনে করার দাবি জানানো হয়েছিল। কিন্তু এলওসির অর্থায়নে প্রকল্পটি বারবার ধাক্কা খায়। নির্ধারিত সময়ে অর্থ না পাওয়ায় প্রকল্পটি বাস্তবায়ন সম্ভব হয়নি। এখন এলওসির অর্থায়নে প্রকল্পটি আর হচ্ছে না।সর্বশেষ পিডিপিপির ওপর প্রকল্প যাচাই কমিটির সভা সূত্রে জানা গেছে, প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী প্রায় ছয় বছর ভারত প্রকল্পে অর্থ ছাড় দেয়নি। ফলে বিকল্প অর্থায়নে এগিয়ে আসছে এআইআইবি। আরও কয়েকটি দেশও ঋণ প্রদানে আগ্রহ দেখাচ্ছে বলে জানিয়েছে রেলওয়ে কর্তৃপক্ষ।বর্তমান প্রকল্প অনুযায়ী, মূল রেললাইন হবে ৯৫ দশমিক ৬ কিলোমিটার এবং লুপ ও ইয়ার্ড হবে ৩৭ দশমিক ৪৯ কিলোমিটার। করতোয়া ও ইছামতী নদীর ওপর দুটি বড় সেতু নির্মাণ করা হবে। এ ছাড়া ২৫টি ছোট সেতু, ৯১টি বক্স কালভার্ট, একটি রোড ওভারপাস, একটি রেল ফ্লাইওভার এবং একটি রোড আন্ডারপাস নির্মাণের পরিকল্পনা রয়েছে।নতুন করে আটটি স্টেশন নির্মাণ করা হবে। এগুলো হলো—সিরাজগঞ্জ জংশন, কৃষ্ণদিয়া, রায়গঞ্জ, চান্দাইকোনা, ছোনকা, শেরপুর, আরিয়া বাজার ও রানীরহাট। পাশাপাশি ১০৬টি লেভেল ক্রসিং গেট এবং ১১টি স্টেশনে কম্পিউটারভিত্তিক সিগন্যালিং ব্যবস্থা স্থাপন করা হবে।প্রকল্প পরিচালক প্রকৌশলী মনিরুল ইসলাম ফিরোজী বলেন, অর্থায়ন নিশ্চিত হলেই টেন্ডার প্রক্রিয়া শুরু করা হবে। রেলওয়ের অতিরিক্ত মহাপরিচালক (অপারেশন) নাজমুল ইসলাম বলেন, রেলে আয় বাড়াতে ডাবল লাইনের কোনো বিকল্প নেই।রেলওয়ে পশ্চিমাঞ্চলের মহাব্যবস্থাপক ফরিদ উদ্দিন বলেন, বিকল্প অর্থায়নের মাধ্যমে প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করা গেলে উত্তরবঙ্গের চিত্র বদলে যাবে।সিরাজগঞ্জ চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির সভাপতি সাইদুর রহমান বাচ্চু বলেন, এই রেলপথ নির্মিত হলে যোগাযোগ ও ব্যবসা-বাণিজ্যে বড় অগ্রগতি আসবে।

Source: সময়ের কন্ঠস্বর

সম্পর্কিত সংবাদ
আজ যেসব এলাকায় ৮ ঘণ্টা বিদ্যুৎ থাকবে না
আজ যেসব এলাকায় ৮ ঘণ্টা বিদ্যুৎ থাকবে না

বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের বিক্রয় ও বিতরণ বিভাগ-২ এর আওতাধীন সিলেট নগরীর গুরুত্বপূর্ণ এলাকার বিভিন্ন জায়গায় আজ বিদ্যুৎ থাকবে না। শনিবার Read more

উচ্ছেদের পর পাহাড়ের নিচে ঠাঁই, ধস আতঙ্কে ১৭০ পরিবার
উচ্ছেদের পর পাহাড়ের নিচে ঠাঁই, ধস আতঙ্কে ১৭০ পরিবার

চট্টগ্রামের আনোয়ারা উপজেলায় বিভিন্ন শিল্পকারখানার কারণে উচ্ছেদ হয়ে বৈরাগ ইউনিয়নের বদুলপুরা গ্রামে আশ্রয় নেয় প্রায় ১৭০টি পরিবার। দীর্ঘ দেড় যুগেরও Read more

জীবিত ৩ স্ত্রীকে মৃত দেখিয়ে ৪র্থ বিয়ের অভিযোগ এসআইয়ের বিরুদ্ধে
জীবিত ৩ স্ত্রীকে মৃত দেখিয়ে ৪র্থ বিয়ের অভিযোগ এসআইয়ের বিরুদ্ধে

রাজশাহীর বাগমারা থানার এসআই আব্দুল মজিদের বিরুদ্ধে প্রতারণা ও বহুবিবাহের গুরুতর অভিযোগ উঠেছে। জীবিত দুই স্ত্রীকে মৃত দেখিয়ে তিনি চতুর্থবারের Read more

বাঘাইছড়িতে চুইঝাল ও আদা চাষীদের নগদ অর্থ বিতরণ
বাঘাইছড়িতে চুইঝাল ও আদা চাষীদের নগদ অর্থ বিতরণ

বাঘাইছড়িতে উন্নতজাত ও প্রযুক্তি সম্প্রসারণ প্রকল্পের (১ম সংশোধিত) আওতায় চুইঝাল ও আদা চাষীদের নগদ অর্থ বিতরণ। রবিবার (১৮ মে) সকাল ১০ Read more

এসএসসির ফল প্রস্তুত, প্রকাশ শিগগির
এসএসসির ফল প্রস্তুত, প্রকাশ শিগগির

এসএসসি ও সমমান পরীক্ষার ফল তৈরির কাজ একেবারে শেষ। এখন সম্ভাব্য তিনটি তারিখ ঠিক করে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ে প্রস্তাব পাঠাবে বাংলাদেশ Read more

আমরা নিরপেক্ষ নই ,    জনতার পক্ষে - অন্যায়ের বিপক্ষে ।    গণমাধ্যমের এ সংগ্রামে -    প্রকাশ্যে বলি ও লিখি ।   

NewsClub.in আমাদের ভারতীয় সহযোগী মাধ্যমটি দেখুন